প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লালদিয়া টার্মিনালে ৯ হাজার কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ
বিশেষ প্রতিবেদক ||
* ৬ হাজার টিইইউসের জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ, বছরে বাড়বে ৯ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতাচট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের বিনিয়োগে নির্মিত এই টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বছরে প্রায় ৪৪ লাখ টিইইউসে উন্নীত হবে। একই সঙ্গে তুলনামূলক বড় জাহাজ সরাসরি টার্মিনালে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। গত রোববার পতেঙ্গার লালদিয়া চরে টার্মিনালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটিতে এপিএম টার্মিনালসের বিনিয়োগের পরিমাণ এখন ৭৬ কোটি ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে লালদিয়া চরে টার্মিনালটি নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমির পরিমাণ ৪৯ দশমিক ১৫ একর। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালসের চুক্তি হয়। চলতি বছরের ২২ এপ্রিল বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের জমি প্রতিষ্ঠানটির কাছে হস্তান্তর করে। নকশা ও অন্যান্য প্রস্তুতি শেষে এখন শুরু হয়েছে মূল নির্মাণকাজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং ২০৩০ সালে টার্মিনালটি চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। নির্মাণ শেষে এপিএম টার্মিনালস ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বাড়বে ৯ লাখ টিইইউস সক্ষমতা : জার্মানভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হামবুর্গ পোর্ট কনসালটিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টিইইউস কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা রয়েছে। লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে এর সঙ্গে আরও প্রায় ৯ লাখ টিইইউস সক্ষমতা যুক্ত হবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বছরে প্রায় ৪৪ লাখ টিইইউসে উন্নীত হবে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত বার্ষিক সক্ষমতা ৮ লাখ টিইইউস। গত অর্থবছর ২০২৫-২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর প্রায় ৩৫ লাখ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। ফলে নতুন টার্মিনালটি চালু হলে বর্তমান চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের কনটেইনার পরিবহন বৃদ্ধির জন্যও অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হবে।বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা : লালদিয়া টার্মিনালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এর ভৌগোলিক অবস্থান। সাগর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল টার্মিনাল এলাকায় যেতে জাহাজকে কর্ণফুলী নদীর কয়েকটি বাঁক অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে গুপ্ত বাঁককে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। লালদিয়া টার্মিনাল এই বাঁকের আগেই, সাগর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। ফলে মূল বন্দরের তুলনায় বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ এখানে বেশি। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের এবং প্রায় ২ হাজার ৮০০ টিইইউস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যায়। লালদিয়ায় ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের প্রায় ৬ হাজার টিইইউস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিতে একই সময়ে তিনটি তুলনামূলক ছোট জাহাজ অথবা দুটি বড় জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। নৌপথের অবস্থানের কারণে রাতেও জাহাজ চলাচলের সুযোগ বাড়বে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।৮০ ধরনের যন্ত্রপাতি : লালদিয়া টার্মিনাল হবে একটি গ্রিনফিল্ড প্রকল্প। অর্থাৎ বিদ্যমান কোনো টার্মিনাল সম্প্রসারণের বদলে নতুন করে জমি উন্নয়ন করে পুরো অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ডিজাইন, নির্মাণ, অর্থায়ন, পরিচালনা ও হস্তান্তর—ডিবিএফওটি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। টার্মিনালে প্রায় ৮০ ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে থাকবে সাতটি আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন। যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ জ্বালানির পরিবর্তে বিদ্যুৎচালিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমির মধ্যে ৩২ একর জায়গায় মূল টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। প্রায় ৭ দশমিক ১৫ একর এলাকায় থাকবে কনটেইনার ইয়ার্ড। আর প্রায় ১০ একর জায়গা ব্যবহার করা হবে ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধার জন্য।বন্দরের আয় হবে, বিনিয়োগ করতে হবে না : লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না। বরং টার্মিনাল পরিচালনার মাধ্যমে নির্ধারিত হারে রাজস্ব পাবে বন্দর। চুক্তি অনুযায়ী, বছরে প্রথম ৮ লাখ কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য প্রতিটি কনটেইনারে বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে ২১ ডলার। ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ কনটেইনার পর্যন্ত প্রতিটির জন্য পাওয়া যাবে ২৩ ডলার। এ ছাড়া টার্মিনাল চালুর আগে এককালীন ফি হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে ২৫০ কোটি টাকা। তবে বন্দর ব্যবহারকারীদের কাছে সরাসরি এই আর্থিক আয় নয়, বরং বন্দরের সক্ষমতা ও সেবার মানে প্রতিযোগিতা তৈরির বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল : লালদিয়া হবে চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল। বর্তমানে বন্দরে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) রয়েছে। এর মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড় ও আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল। এর বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১০ লাখ টিইইউস হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১২ লাখ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বশেষ নির্মিত টার্মিনাল পিসিটি। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালটি পরিচালনা করছে। ফলে লালদিয়া চালু হলে একই বন্দরে একাধিক অপারেটরের মাধ্যমে কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সুযোগ বাড়বে। বন্দর ব্যবহারকারীদের প্রত্যাশা, এর ফলে সেবার মান ও দক্ষতার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং পণ্য খালাসে সময় কমবে।বিদেশি বিনিয়োগে নতুন বার্তা : লালদিয়া প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ শুরুতে ৫৫ কোটি ডলারের বেশি ধরা হলেও পরে তা বেড়ে ৭৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বন্দর ও লজিস্টিক খাতে এটি বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের লালদিয়া টার্মিনাল একটি বড় মাইলফলক। চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য একটি লজিস্টিক হাব হয়ে উঠবে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে গ্রিনফিল্ড প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। এটি দেশের জন্য গৌরবের এবং বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য ইতিবাচক বার্তা। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়ত হামিম বলেন, লালদিয়া চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল। নতুন এই টার্মিনাল নির্মাণের মধ্য দিয়ে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত