প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
ফুডপান্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ : দাবি না মানলে অর্ডার বন্ধের হুঁশিয়ারি
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
কমিশনের
বাইরে নানা ধরনের চার্জ,
জটিল হিসাব, অর্ডার বাতিলের লোকসান, অপেক্ষার মাশুল, একতরফা জরিমানা ও রিফান্ডের নামে
টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ
উঠেছে অনলাইনে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডার বিরুদ্ধে। রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, বিক্রির টাকা পেতেও ১৩
দিন বা তার বেশি
সময় লাগছে। এতে একদিকে বাড়ছে
ব্যবসার খরচ, অন্যদিকে সংকুচিত
হচ্ছে মুনাফা। এমন পরিস্থিতিতে ফুডপান্ডার
একতরফা ও অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক
নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকেরা।তাদের
দাবি, কমিশনসহ সব ধরনের চার্জ
মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশের মধ্যে
রাখতে হবে। অন্যথায় চট্টগ্রাম
মহানগরের রেস্তোরাঁগুলোতে ফুডপান্ডার মাধ্যমে স্থায়ীভাবে অর্ডার গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ার
হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। শনিবার
(১০ অক্টোবর) বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে
এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে
ধরা হয়। এতে বক্তব্য
রাখেন সংগঠনটির সভাপতি মো. ইমতিয়াজ উদ্দিন
নওশাদ ও সাধারণ সম্পাদক
মঞ্জুরুল হক। এসময় চট্টগ্রামের
রেস্তোরাঁ মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ
সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিকরা বলেন, প্রযুক্তির বিরোধিতা করছেন না তারা। বরং
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়িক ব্যবস্থায় ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা
চান। কিন্তু ফুডপান্ডার বর্তমান নীতিতে রেস্তোরাঁ মালিকদের ওপর একের পর
এক আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
এতে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁর কর্মচারী
ও তাদের পরিবারের ওপরও।রেস্তোরাঁ
মালিকদের অভিযোগ, ফুডপান্ডার সঙ্গে চুক্তিতে নির্ধারিত কমিশনের বাইরেও অনলাইন পেমেন্ট চার্জ, অপেক্ষার মাশুল, কমিশনের ওপর মূল্য সংযোজন
কর (ভ্যাট), ট্যাব ফি ও ইন্টারনেট
ফিসহ বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে
নেওয়া হয়। ফলে কাগজে-কলমে বিক্রি ভালো
দেখালেও সব খরচ বাদ
দিয়ে হাতে থাকছে সামান্য
অর্থ। এসব চার্জের বিস্তারিত
হিসাবও সহজে বোঝা যায়
না বলে দাবি তাদের।মালিকদের
ভাষ্য, মাস শেষে ফুডপান্ডার
পাঠানো হিসাব এতটাই জটিল যে কোন
খাতে কত টাকা কাটা
হয়েছে, তা বুঝতে হিমশিম
খেতে হয়। কোনো কোনো
ক্ষেত্রে হিসাবের খাত ও কর্তনের
কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এতে
নিজেদের বিক্রি, কমিশন ও প্রকৃত আয়
যাচাই করাও কঠিন হয়ে
পড়ে।অর্ডার
বাতিলের লোকসান রেস্তোরাঁর, দায়ও তাদেররেস্তোরাঁ
মালিকদের অভিযোগ, ফুডপান্ডার প্রযুক্তিগত সমস্যা কিংবা খাবার সরবরাহের ব্যবস্থাপনায় জটিলতার কারণে অর্ডার বাতিল হলেও এর আর্থিক
দায় নিতে হয় রেস্তোরাঁ
মালিকদের। একটি অর্ডার পাওয়ার
পর খাবার তৈরিতে কাঁচামাল, শ্রম ও সময়
ব্যয় হয়। কিন্তু খাবার
তৈরি হয়ে যাওয়ার পর
অর্ডার বাতিল হলে সেই খাবার
অন্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা
সব সময় সম্ভব হয়
না। এতে খাবারের পুরো
খরচই লোকসানে পরিণত হতে পারে। তাদের
আরও অভিযোগ, সরবরাহকর্মী বা রাইডার দেরিতে
খাবার সংগ্রহ করলে গ্রাহক অর্ডার
বাতিল করেন। অথচ এ ধরনের
পরিস্থিতিতেও রেস্তোরাঁকে জরিমানা বা আর্থিক ক্ষতির
মুখে পড়তে হয়। যে
বিলম্বের জন্য রেস্তোরাঁ দায়ী
নয়, তার খেসারতও কেন
রেস্তোরাঁ মালিকদের দিতে হবে, সেই
প্রশ্ন তুলেছেন তারা। গ্রাহকের
অভিযোগের ভিত্তিতে অর্থ ফেরত দেওয়ার
ক্ষেত্রেও একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন রেস্তোরাঁ মালিকরা। তাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে এবং
রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না শুনেই পাওনা
টাকা থেকে অর্থ কেটে
নেওয়া হয়। এতে ব্যবসায়ীরা
নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ থেকে
বঞ্চিত হন। বিক্রির
টাকা পেতেও অপেক্ষা রেস্তোরাঁ
মালিকদের আরেকটি বড় অভিযোগ, ফুডপান্ডার
মাধ্যমে বিক্রি হওয়া খাবারের টাকা
পেতে ১৩ দিন বা
তারও বেশি সময় লেগে
যায়। অথচ রেস্তোরাঁ চালাতে
প্রতিদিনই কর্মচারীদের বেতন, দোকানভাড়া, কাঁচামাল কেনা, বিদ্যুৎ বিলসহ নানা খরচ মেটাতে
হয়। বিক্রির টাকা দীর্ঘ সময়
আটকে থাকলে চলতি মূলধনের সংকট
তৈরি হয়। এতে নিয়মিত
ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের
মতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিক্রি বাড়লেও অতিরিক্ত চার্জ ও নানা ধরনের
কর্তনের কারণে প্রকৃত মুনাফা কমে গেলে সেই
বিক্রির সুফল রেস্তোরাঁ মালিকেরা
পাচ্ছেন না। অন্যদিকে খাবারের
মান বজায় রাখা, কর্মচারীদের
বেতন দেওয়া ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ব্যয়
বহনের দায়িত্ব তাদেরই নিতে হচ্ছে।দেশীয়
প্ল্যাটফর্মের কমিশন ১৫ শতাংশ, প্রশ্ন
ফুডপান্ডাকে নিয়েসংবাদ
সম্মেলনে দেশীয় খাবার সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্ম ফুডির উদাহরণ টেনে রেস্তোরাঁ মালিকেরা
বলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠান ১৫ শতাংশ সমন্বিত
কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারলে ফুডপান্ডার
ক্ষেত্রে কমিশনের বাইরে এত ধরনের চার্জ
কেন থাকবে? তাদের দাবি, সব চার্জ কমিশনের
মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে সর্বোচ্চ ১৫
শতাংশ সমন্বিত কমিশন নির্ধারণ করতে হবে। রেস্তোরাঁ
মালিকদের ছয় দফা দাবির
মধ্যে রয়েছে—কমিশনের বাইরে সব ধরনের অতিরিক্ত
চার্জ বাতিল, সহজ ও স্বচ্ছ
খাতওয়ারি হিসাব দেওয়া, রেস্তোরাঁর দোষ ছাড়া অর্ডার
বাতিল হলে খাবারের সম্পূর্ণ
খরচ বহন, রাইডারের বিলম্বের
কারণে জরিমানা বন্ধ, অভিযোগ যাচাই ও রেস্তোরাঁর বক্তব্য
না শুনে অর্থ কর্তন
বন্ধ এবং সর্বোচ্চ সাত
দিনের মধ্যে বিক্রির টাকা পরিশোধ। দাবি
না মানলে ফুডপান্ডা পুরোপুরি বয়কটের হুঁশিয়ারিরেস্তোরাঁ মালিক সমিতি জানিয়েছে, ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষ তাদের দাবিগুলো মেনে না নিলে
চট্টগ্রাম মহানগরের রেস্তোরাঁ মালিকেরা সম্মিলিতভাবে এ প্ল্যাটফর্মে অর্ডার
গ্রহণ স্থগিত বা সম্পূর্ণ বন্ধ
করার কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন।
এতে ফুডপান্ডার পাশাপাশি অনলাইন অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল গ্রাহকরাও
প্রভাবিত হতে পারেন। একই
সঙ্গে অনলাইন খাবার সরবরাহ খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা
ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা
কমিশন, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের
হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা। এ খাতের জন্য
সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানিয়েছেন রেস্তোরাঁ
মালিকেরা, যাতে বহুজাতিক অনলাইন
প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ব্যবসা করতে গিয়ে দেশীয়
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা
বৈষম্যের শিকার না হন।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত