প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আবারও উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতির মাঠ?
বিশেষ প্রতিবেদক ||
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের ছয় মাস না পেরোতেই রাজনীতির মাঠে নতুন করে উত্তাপের আভাস দেখা যাচ্ছে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ধারাবাহিক কর্মসূচি, লং মার্চের প্রস্তুতি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল—দুই বিপরীতমুখী রাজনৈতিক তৎপরতা ঘিরে সামনে এসেছে নতুন প্রশ্ন।একদিকে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে নামছে বিরোধী জোট। অন্যদিকে রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি তুলে মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। এর মধ্যেই গত ৫ আগস্ট অনলাইন বক্তব্যে ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।ফলে প্রশ্ন উঠছে—সরকারের ছয় মাসের মাথায় রাজনীতির মাঠ কি আবারও উত্তপ্ত হওয়ার দিকে যাচ্ছে? বিরোধী জোটের কর্মসূচি কতটা জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে পারবে? সরকার কীভাবে তা মোকাবিলা করবে? আর শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবে কার্যকর হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তার প্রভাব কতটা পড়বে?রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনই পরিস্থিতিকে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করার কারণ নেই। তবে একাধিক রাজনৈতিক শক্তির পাল্টাপাল্টি সক্রিয়তা আগামী কয়েক মাসে রাজনীতির সমীকরণে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে ধারাবাহিক কর্মসূচির প্রস্তুতি নিয়েছে। জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে লং মার্চ শুরু হওয়ার কথা। বিভিন্ন মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পথসভা শেষে চট্টগ্রামের লালদিঘি মাঠে মূল জমায়েত করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহর অভিমুখেও একই ধরনের কর্মসূচি পালন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবশেষে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা জানিয়েছে জোটটি।কর্মসূচি সফল করতে জোটভুক্ত দলগুলো দফায় দফায় বৈঠক করছে। প্রচারণায়ও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ে পোস্টার-লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।তবে বড় প্রশ্ন জনসম্পৃক্ততা নিয়ে। সরকারের মেয়াদ মাত্র ছয় মাস। এই সময়ে বিরোধী দলের ডাকে সাধারণ মানুষ কতটা সাড়া দেবে, সেটিই এখন আন্দোলনের বড় পরীক্ষা।রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বিরোধী দল হিসেবে রাজপথে কর্মসূচি দেওয়া স্বাভাবিক। তবে বর্তমান কর্মসূচিকে সরকারকে তাৎক্ষণিকভাবে বিপাকে ফেলার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন না তিনি।তার ভাষায়, বিরোধী দল এখন মূলত নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা কবে ফিরবেন, সে বিষয়েও এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।১১ দলের কর্মসূচি নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে অবশ্য ভিন্নমত রয়েছে।বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, শুধু কর্মসূচি ঘোষণা করলেই রাজপথ উত্তপ্ত হয় না। সাধারণ মানুষ কোনো আন্দোলনে তখনই যুক্ত হয়, যখন তারা সেখানে নিজেদের স্বার্থের প্রতিফলন দেখতে পায়।তার প্রশ্ন, বিরোধী দলের কর্মসূচি কতটা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকটের সঙ্গে যুক্ত?তার মতে, জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কোনো ইস্যুতে আন্দোলন হলে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নামতে পারে। কিন্তু গতানুগতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে সেই জনসম্পৃক্ততা তৈরি করা কঠিন।তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার এ বিষয়ে আশাবাদী। তার দাবি, ১১ দলের কর্মসূচি ঘিরে মিত্র দলগুলোর ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও সাড়া দেখা যাচ্ছে।তার মতে, কর্মসূচির দাবিগুলো জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হওয়ায় মানুষ এতে অংশ নেবে।অর্থাৎ আন্দোলনের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ একটাই—দলীয় কর্মী-সমর্থকের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষকে রাজপথে আনা।বিরোধী জোটের কর্মসূচির পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনায় আরও বড় হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ।কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দলটির অংশগ্রহণের সুযোগ এখনো সীমিত।এর মধ্যে ৫ আগস্টের অনলাইন বক্তব্যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি যেকোনো মূল্যে দেশে ফেরার কথা জানান এবং আইনের কাছে আত্মসমর্পণের কথাও বলেন।এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে—এটি এখন রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন।কারণ শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু আইনগত নয়, সরাসরি রাজনৈতিক বিষয়েও পরিণত হতে পারে। তিনি দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয়তা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের মতে, শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে পারলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের একটি ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।তবে তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সমঝোতা হয় কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান।জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যেসব রাজনৈতিক দল ও শক্তি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়েছে, তারা আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনকে কীভাবে দেখছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।তারা যদি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিরোধিতা করে রাজপথে নামে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। বিপরীতে রাজনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়ায় বিষয়টির নিষ্পত্তি হলে সংঘাতের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকবে।ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবে পরিণত হবে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—ফিরলে তাকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী হয়।সরকারের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। একদিকে বিরোধী দল রাজপথে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে চাইছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো ইস্যু।বিরোধী দল বলছে, সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের সমাধান করতে পারছে না। এসব দাবিকে কেন্দ্র করেই তারা মাঠে নামছে।জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমের দাবি, বিরোধী দল গত ছয় মাসে সরকারের গঠনমূলক কাজে সহযোগিতা করেছে। এখন জনগণের অধিকার আদায়ের জন্যই তারা কর্মসূচি দিচ্ছে। কর্মসূচিতে জ্বালাও-পোড়াও না থাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার কারণ দেখছেন না তিনি।সরকারের পক্ষ থেকেও বিরোধী দলের কর্মসূচিকে রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখার কথা বলা হচ্ছে। তবে বিএনপির নেতারা বিরোধীদের দায়িত্বশীল আচরণের প্রত্যাশা করছেন।বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিরোধী দল আন্দোলন করবে—এটি তাদের রাজনৈতিক অধিকার। তবে তাদের জনগণের কাছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রকৃত কারণ তুলে ধরার পাশাপাশি হঠকারী কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানও আশা করছেন, বিরোধী দল দায়িত্বশীল আচরণ করবে। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলেছেন তিনি।সব মিলিয়ে আগামী দিনের রাজনীতিতে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।প্রথমত, ১১ দলের আন্দোলন কতটা জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকার বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কীভাবে মোকাবিলা করে। তৃতীয়ত, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবে কার্যকর হলে জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তিগুলো কী অবস্থান নেয়।বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সংঘাত অনিবার্য—এমনটা বলার সুযোগ নেই। কারণ বিরোধী জোটও তাদের কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরছে। সরকারও এখন পর্যন্ত বিরোধী দলের কর্মসূচিকে সরাসরি নিষিদ্ধ করার অবস্থান নেয়নি।তবে রাজনীতির মাঠে একাধিক শক্তির সক্রিয়তা বাড়ছে। একটি পক্ষ সরকারকে চাপ দিতে চাইছে, আরেকটি পক্ষ নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান এবং পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনর্বিন্যাসও চলছে।ফলে আগামী কয়েক মাসে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে যাবে, তা শুধু সরকারের জনপ্রিয়তা বা বিরোধী দলের কর্মসূচির ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে জনগণের সাড়া, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অগ্রগতি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত