প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের ৬৫ দলিল রেজিস্ট্রি!
গাজী গোফরান ||
সরকারি খাসজমি ও পাহাড়খেকোদের আখড়া হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের স্পর্শকাতর এলাকা ‘জঙ্গল সলিমপুর’ ফের সংবাদের শিরোনামে। তবে এবার কোনো যৌথ অভিযান কিংবা গোলাগুলির কারণে নয়, বরং জেলা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সীতাকুণ্ড সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গোপনে সম্পন্ন হওয়া এক নজিরবিহীন ও রহস্যজনক দলিল সম্পাদনকে কেন্দ্র করে। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কসংলগ্ন হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ও পাহাড়বেষ্টিত ভূখণ্ডে র্যাবের (এসআরবি) এক কর্মকর্তা হত্যা মামলার প্রধান আসামি এবং আলীনগরে দীর্ঘদিন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা ‘ইয়াসিন বাহিনী’র প্রধান মো. ইয়াসিনের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ জমির বিক্রয় দলিল এক দিনেই রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব নিজের বদলির ঠিক আগের দিন অবিশ্বাস্য গতিতে ইয়াসিনের নামের এসব নথিপত্র ইস্যু করে দেন। বদলির ঠিক আগমুহূর্তে বুধবার (২৮ অক্টোবর) এক দিনে বিভিন্ন পরিমাণের মোট ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিল সম্পাদন করার এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টি জানাজানি হতেই পুরো চট্টগ্রাম প্রশাসনিক অঙ্গনে তীব্র তোলপাড় ও প্রশাসনিক অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে।উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সরাসরি আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়। জেলা প্রশাসকের এই মৌখিক আবেদনের প্রেক্ষিতে আইন মন্ত্রণালয় দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের পূর্বনির্ধারিত বদলির আদেশ আগামী সাত দিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে, যাতে তদন্ত কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা যায়। অন্যদিকে ঘটনার থৈ পেতে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম তাৎক্ষণিকভাবে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবকে তলব করে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।সংশ্লিষ্ট সুত্রে সংগৃহীত তথ্যে জানা গেছে, সম্প্রতি সরকারের এক প্রশাসনিক আদেশে গত সোমবার রায়হান হাবীবসহ দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে একযোগে এক কর্মস্থল থেকে অন্য কর্মস্থলে বদলি করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের বৃহস্পতিবারের মধ্যেই তাঁদের বর্তমান কর্মস্থলের সমস্ত দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। কিন্তু নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়োর মধ্যেই গত বুধবার চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন সংশ্লিষ্ট জমিগুলোর আনুষঙ্গিক নথিপত্র ও চূড়ান্ত আবেদন নিয়ে সীতাকুণ্ড সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে হাজির হন। এর পরপরই বিদায়ী সাব-রেজিস্ট্রার কোনো ধরনের উচ্চতর যাচাই-বাছাই ছাড়া অত্যন্ত দ্রততার সঙ্গে ইয়াসিনের স্বত্বাধিকারী নামীয় জমিগুলোর বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন এবং বিভিন্ন গ্রহীতার নামে নথিপত্র ইস্যু করার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।এক দিনে কোটি কোটি টাকার ভূসম্পত্তির ৬৫টি বিতর্কিত দলিল কীভাবে রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হলো, এমন প্রশ্নের মুখে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব তাঁর প্রশাসনিক সাফাইতে দাবি করেন, সীতাকুণ্ড ভূমি অফিসের প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র অনুযায়ী এসব জমি আসামি ইয়াসিনের নামে নিয়মিত নামজারি বা মিউটেশন করা আছে। পাশাপাশি জমিগুলোর জন্য নিয়মিত হালসন পর্যন্ত ভূ-সম্পত্তি উন্নয়ন কর বা খাজনাও পরিশোধ করা হয়েছে। আইনজীবী নাজিম উদ্দিন সমস্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র এবং দলিলসহ আবেদন জমা দেওয়ায় এবং প্রাথমিক দৃষ্টিতে কাগজপত্র সঠিক মনে হওয়ায় দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, নিয়ম মেনেই তিনি এ বিষয়ে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পূর্বে অবগতির পর এই কাজ সম্পন্ন করেছেন। জঙ্গল সলিমপুরের মতো সরকারের অতীব সংবেদনশীল ও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকা এলাকার জমি নিয়ে প্রতিনিয়ত সংবাদের শিরোনাম হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এমন নথিপত্র রেজিস্ট্রি সম্ভব, এমন প্রশ্নের জবাবে সাব-রেজিস্ট্রার দাবি করেন, তাঁরা মূলত নথিপত্রের আইনি বৈধতা পরীক্ষা করে থাকেন এবং জঙ্গল সলিমপুরের বিতর্কিত জমি রেজিস্ট্রির বিষয়ে দপ্তর থেকে বিশেষ কোনো নিষেধাজ্ঞার লাল ফিতা টাঙানো ছিল না। ফলে বিদ্যমান আইন মেনে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই দলিল সম্পাদিত হয়েছে। তবে ইউএনওর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি স্বীকার করেন, পলাতক আসামি ইয়াসিন নিজে অফিসে সশরীরে উপস্থিত হননি, বরং তাঁর পক্ষে আইনজীবী কাগজপত্র পেশ করেছিলেন।অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপের বিষয়ে নিশ্চিত করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, বুধবারে ঘটনাটি তাঁদের গোচরে আসার পরপরই তাঁরা আইন মন্ত্রণালয়কে মৌখিকভাবে অবহিত করেছেন এবং পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসকের এই অবস্থানের কারণেই বদলি হওয়া সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবকে আপাতত চট্টগ্রাম ছাড়তে দেওয়া হচ্ছে না এবং তাঁর বদলির নির্দেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত রেখেছে মন্ত্রণালয়।চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উল্টো দিকের সড়ক ধরে পাহাড়ের গহীনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের বিস্তীর্ণ জনপদ। জেলা প্রশাসনের সরকারি খাসজমির তালিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর মূল্যবান খাসজমি রয়েছে। নগরের প্রধান লিঙ্ক রোডের আশপাশে বর্তমানে প্রতি শতক জমির আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। ফলে জঙ্গল সলিমপুরের পুরো এলাকার ভূসম্পদের বাণিজ্যিক আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় হাজার হাজার কোটি টাকায়। দীর্ঘদিন ধরে এই বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সরকারি পাহাড় ও সম্পত্তি স্থানীয় ভূমিদস্যু, পাহাড়খেকো এবং সশস্ত্র রাজনৈতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অবৈধ নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিশেষ করে আলীনগর এলাকাটি দীর্ঘ দিন ধরে চট্টগ্রামের একাধিক থানার তালিকায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন ও তার ক্যাডার বাহিনীর সম্পূর্ণ কব্জায় ছিল।পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি স্থাপন ও কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য রক্ষার এই রক্তাক্ত ইতিহাস চরম মাত্রায় পৌঁছায় চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি। ওই দিন চিহ্নিত এক শীর্ষ আসামিকে গ্রেপ্তার করতে একাধিক মাইক্রোবাস নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে ঝটিকা অভিযানে যায় র্যাবের একটি বিশেষ আভিযানিক দল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোমাত্রই মাইকে ঘোষণা দিয়ে ইয়াসিন বাহিনী ও তার অনুসারী একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে হামলা চালায়। এ সময় বর্বরোচিত ও নৃশংস হামলায় ঘটনাস্থলেই নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে এবং আহত হন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও অন্তত তিনজন সদস্য। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় সন্ত্রাসী ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।র্যাব কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে জঙ্গল সলিমপুর থেকে সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করতে এবং রাষ্ট্রের শত শত একর জমি দখলমুক্ত করতে চলতি বছরের ৯ মার্চ ইতিহাসের বৃহত্তম আভিযানিক পদক্ষেপ নেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সে সময় সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের সমন্বয়ে একটি অভূতপূর্ব যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। সেই সাঁড়াশি অভিযানে পর্যদুস্ত হয়ে সন্ত্রাসী ইয়াসিন ও তার ক্যাডাররা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হয়। যৌথ অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এলাকাটিতে অবস্থিত দুটি স্থানীয় বিদ্যালয়ে র্যাব ও পুলিশের দুটি স্থায়ী শক্তিশালী নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে সেখানে সরকারের একাধিক মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ চলছে। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক মুহূর্তে পলাতক এক হত্যা মামলার আসামির নামে থাকা ৬৫টি স্পর্শকাতর দলিল সরকারি কার্যালয় থেকে রেজিস্ট্রি হয়ে যাওয়ার ঘটনা সাধারণ নাগরিক ও প্রশাসনিক মহলে চরম ক্ষোভ ও গভীর বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন মহলে তদন্তের প্রস্তুতি চলছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত