প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
সাংবাদিকদের ওপর হামলা যেন রুটিনে পরিণত হয়েছে- আহমেদ আবু জাফর
বিশেষ প্রতিবেদক ||
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সরকারি বাংলোয় ডেকে নিয়ে সাংবাদিক মিজানকে মারধরের অভিযোগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর। তিনি বলেছেন, “প্রতিনিয়ত সারাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন, হুমকি ও হয়রানির ঘটনা যেন একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।”বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সাংবাদিক মিজানকে মারধরের অভিযোগ সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে এ উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে।আহমেদ আবু জাফর বলেন, সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এসেছে নানা রদবদল। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা বন্ধ হয়নি। ৫ আগস্টের পর দেশের পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসবে এবং সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপর একের পর এক হামলার অভিযোগ সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।তিনি বলেন, সাংবাদিকরা রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ এবং জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের সংবাদ তুলে ধরেন। সত্য প্রকাশ ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের যদি হামলা, হুমকি কিংবা নির্যাতনের শিকার হতে হয়, তাহলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য উদ্বেগজনক। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সাংবাদিক সমাজের দাবি নয়, এটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত।লোহাগাড়ার ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে জাতীয় সাপ্তাহিক ‘সময়ের প্রয়াস’-এর লোহাগাড়া উপজেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক মিজানকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের সরকারি বাংলোয় ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে দ্রুত যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে অবহিত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।ভুক্তভোগী সাংবাদিক মিজানের অভিযোগ, ইউএনওর বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং স্থানীয় কয়েকজনের কর্মকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের জেরে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেলাল তাঁকে ফোন করে ইউএনওর সরকারি বাংলোয় যেতে বলেন।সেখানে যাওয়ার পর তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে ইউএনও তাঁকে গালিগালাজ ও মানসিকভাবে হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ করেন মিজান। তাঁর দাবি, বাংলোয় আগে থেকেই উপস্থিত স্থানীয় খোরশেদ, মাঈন উদ্দীনসহ ১০ থেকে ১২ জনের মধ্যে কয়েকজন নিজেদের বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। ইউএনওর উপস্থিতিতে ওই ব্যক্তিরা তাঁকে মারধর করেন বলেও অভিযোগ তাঁর।মিজানের অভিযোগ, বাংলো থেকে বের করে দেওয়ার পর তিনি লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরে এ ঘটনায় মামলা করতে থানায় যাওয়ার পথে কয়েকজন তাঁর পথরোধ করে আবারও হামলার চেষ্টা করেন। তাঁদের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে তিনি লোহাগাড়া থানায় আশ্রয় নেন। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া চলছিল বলে জানান তিনি। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন এই সাংবাদিক।এদিকে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, “আমি যেহেতু বিষয়টি মাত্র অবগত হলাম, তাই জেলা প্রশাসককে এখনই জানাচ্ছি, যাতে এ বিষয়ে দ্রুত যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টি শোনার পর আমার নিজেরও খুব খারাপ লাগছে।”এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করবেন বলে জানান।আহমেদ আবু জাফর আরও বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলে শুধু নিন্দা জানানো বা আশ্বাস দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের বিচার না হলে সাংবাদিকদের ওপর হামলার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাংবাদিক মিজানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান। সাংবাদিকদের বিভিন্ন মহলও এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত