প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন বার্তার ইঙ্গিত
বিশেষ প্রতিবেদক ||
বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আকারে ছোট হলেও চিঠিটিতে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বার্তা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রশংসা এবং অদূর ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশা প্রকাশকে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।চিঠিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান। সেখানে তিনি বলেন, “Boeing will not let you down, and I will never forget.” একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।চিঠির শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে সাক্ষাতের প্রত্যাশার কথাও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফলে বার্তাটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তির জন্য ধন্যবাদজ্ঞাপন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ আরও বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দিচ্ছে।বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। উড়োজাহাজ কেনার সঙ্গে শুধু ক্রয়মূল্য পরিশোধের বিষয় জড়িত নয়। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, পাইলট ও প্রকৌশলী প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অন্যান্য সেবা যুক্ত থাকে।ফলে বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে এভিয়েশন খাতের আরও বিস্তৃত সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল (এমআরও), দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং এভিয়েশন-সংশ্লিষ্ট সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।তবে এসব সুযোগ বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশ কতটা বৃহত্তর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপ দিতে পারে তার ওপর।ট্রাম্পের চিঠির রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে বাংলাদেশের বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান, সমুদ্রপথ, বন্দর, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কারণে ঢাকা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিল্প ও উন্নয়ন প্রকল্পে চীনা সহযোগিতা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাব্য বড় অংশীদার। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুই বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখা।চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগকে বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের চিঠি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এটিকে বাংলাদেশ চীনের বলয় থেকে সরে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে—এমন সরল ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে জাতীয় স্বার্থে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হিসেবেই বিষয়টি দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যম ও ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী অংশীদারিত্বের কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশও বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই ধরনের ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ পাচ্ছে।চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করাও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের ইতিবাচক বার্তা তাৎপর্য বহন করে।তবে এটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি মার্কিন আনুষ্ঠানিক সমর্থন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি দুই দেশের সরকারের মধ্যে ইতিবাচক যোগাযোগ এবং সম্পর্ক উন্নয়নের রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি বাস্তবসম্মত।বিশেষ করে ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমানের সম্ভাব্য বৈঠকের ইঙ্গিত দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চপর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে বৈঠক হলে আলোচনার পরিধি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম।দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে দৃশ্যমান রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধায় পরিণত করা।বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ, মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং উচ্চমূল্যের শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।তবে এ ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা বিবেচনা করে প্রতিযোগিতামূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশের জন্য বেশি লাভজনক হতে পারে।চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতাও বাড়বে। ট্রাম্পের চিঠি দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ককে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন পরিবর্তন হতে পারে। ফলে হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি মার্কিন কংগ্রেস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত মহলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একইভাবে চীনের সঙ্গেও সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতি, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অবকাঠামোভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় আরও গভীর করা প্রয়োজন।বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি ঝুঁকিও তৈরি করছে। বাংলাদেশ যদি এই প্রতিযোগিতাকে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও দক্ষতা উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা অন্য পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কে চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে ঢাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।সব মিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক পরিবর্তনের ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তকেও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বাংলাদেশের কৌশলগত ঝুঁকে পড়ার একক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তবে চিঠিটি এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশ একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব ধরে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত