প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
লোহাগাড়ায় ওয়াকফ এস্টেটের জমি দখল ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ঐতিহ্যবাহী ‘আহমদুর রহমান ওয়াকফ এস্টেট’-এর সম্পত্তি দখল, জালিয়াতি, সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ বাজার পরিচালনা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসনের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা, প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যক্তিসহ মোট ২৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর লোহাগাড়ার বাসিন্দা মো. শাহজাহান বাদী হয়ে চট্টগ্রাম জেলা দায়রা জজ ও স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, সম্পত্তি বিক্রি, সরকারি বরাদ্দ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন খাতে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ আনা হয়েছে।আদালত মামলাটি গুরুত্ব সহকারে আমলে নিয়ে প্রাথমিক পর্যালোচনার পর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন। বাদীপক্ষের আইনজীবীর শুনানি শেষে বিচারক বিষয়টি আগামী ১৭ তারিখ শুনানির জন্য দিন ধার্য করে তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেন।মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রেজিস্ট্রি করা ৪১৮১ নম্বর দলিলের মাধ্যমে প্রায় ৬ কানি ৭ গন্ডা ২ কড়া সম্পত্তি আহমদুর রহমান ওয়াকফ এস্টেটের নামে ওয়াকফ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ওই সম্পত্তির একটি অংশ বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ বাদীপক্ষের।মামলার বিবরণ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা নিজেদের ভুয়া মোতাওয়াল্লী পরিচয় দিয়ে ওয়াকফ এস্টেটের সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ ও দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই জমিকে কখনো স্কুলের মাঠ, কখনো কর্নেল অলি আহমেদ স্টেডিয়াম মাঠ, আবার কখনো শাহপরী মাঠ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ওয়াকফ মসজিদের সম্পত্তির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তা বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়েছে। মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ৮ নম্বর শাহপুর ও কর্নেল অলি আহমেদ স্টেডিয়াম মাঠ সংস্কারের জন্য বরাদ্দ করা দুই লাখ টাকা কোনো দৃশ্যমান কাজ না করেই আত্মসাৎ করা হয়েছে।পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নামে ভুয়া ও বেনামী প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ তছরুপের অভিযোগও করা হয়েছে। বাদীপক্ষ এসব বিষয়ে তদন্ত করে সরকারি অর্থের প্রকৃত ব্যবহার ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে। ওয়াকফ এস্টেটের জায়গায় অবৈধভাবে গরুর হাট বসানো এবং স্থানীয় দোকানপাট থেকে দৈনিক ভিত্তিতে মাসোহারা ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগও মামলায় করা হয়েছে।অভিযোগ অনুযায়ী, আরাকান হাইওয়ের দুই পাশে দোকান নির্মাণ, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা তৈরি এবং বিভিন্ন স্থাপনা ব্যবহারের নামে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেন করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা বৈধ ব্যবস্থাপনা ছিল কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বাদী।মামলায় গত ১ অক্টোবরের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, অবৈধ বাজার কমিটি গঠনের বিষয়ে কথা বলায় স্থানীয় সংবাদকর্মী মিজানকে অভিযুক্তরা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, শারীরিক ও মানসিকভাবে অপদস্থ এবং মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানোর হুমকি দেন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় মামলার বাদী মো. শাহজাহানের কাছেও দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।এছাড়া স্থানীয় ভূমি অফিসে নামজারি, জন্মনিবন্ধন সনদ, ওয়ারিশ সনদ ও ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের প্রয়োজন হয় বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।এ বিষয়ে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদ-বিন-আখন্দ সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বাদীপক্ষের অভিযোগের পর আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। এখন মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা, ওয়াকফ সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অন্যান্য অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে কতটা প্রমাণিত হয় সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।স্থানীয়দের দাবি, আহমদুর রহমান ওয়াকফ এস্টেটের সম্পত্তি যদি সত্যিই অবৈধভাবে দখল বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা জনসম্মুখে প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন— ১ নম্বর আসামি মোতাওয়াল্লী দাবিদার ভুয়া চক্রের সদস্য, ২ নম্বর আসামি লোহাগাড়া উপজেলার বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজিদ-বিন-আখন্দ, ৩ নম্বর আসামি সাবেক ইউএনও মো. আহসান হাবিব জিতু, ৪ নম্বর আসামি সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইফরাদ বিন মুনির, ৫ নম্বর আসামি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নাছির আহাসান জাকির এবং ৬ নম্বর আসামি লোহাগাড়া শাহপীর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর। এছাড়া অন্যান্য আসামিরা হলেন— আশরাফুল (৭), দিদারুল আলম (৮), কামাল (৯), মানিক (১০), শওকত হোসেন (১১), শাহজাহান (১২), রফিক উদ্দীন (১৩), আবুল মনসুর (১৪), মো. সায়েম (১৫), নুরুল আলম প্রকাশ নুরুল ডাকাত (১৬), হেলাজ (১৭), শাহাব উদ্দীন (১৮) এবং এজাহারভুক্ত আরও বেশ কয়েকজনসহ সর্বমোট ২৫ জন।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত