প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লোহাগাড়ায় যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিনের শেল্টারে বেপরোয়া কিশোরগ্যাং
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় এক স্কুলশিক্ষককে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতের ঘটনায় ‘ডেভিড জিহাদ’ নামে এক স্বঘোষিত কিশোরগ্যাং নেতার নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একটি কিশোরগ্যাং। এরই মধ্যে ওই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে স্কুলছাত্রকে তুলে নেওয়া, প্রধান শিক্ষককে মোবাইল ফোনে হুমকি এবং সর্বশেষ শিক্ষককে হামলার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে শিক্ষক হামলার ঘটনায় ডেভিড জিহাদের সম্পৃক্ততা এখনো পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের শহীদ মেজর নাজমুল হক সড়কে নজরুল ইসলাম (৩৫) নামে এক স্কুলশিক্ষকের ওপর এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়েছে। আহত নজরুল ইসলাম ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।এর আগে গত ২২ আগস্ট ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহকে স্কুলের সামনে থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে ডেভিড জিহাদের নেতৃত্বাধীন একটি কিশোরগ্যাংয়ের বিরুদ্ধে।বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দীন ভূঁইয়া সুমনের ভাষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তিনি সহকর্মী নাজিম উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে বটতলী স্টেশনের একটি রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করেন। একই সময় ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে আয়ান নামে একজনকে আটক করে লোহাগাড়া থানা-পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।প্রধান শিক্ষক বলেন, গত ২২ আগস্ট আমাদের বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহকে স্কুলের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে সহকর্মী নাজিম উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে বটতলী স্টেশনের একটি রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে তাকে উদ্ধার করি। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত আয়ানকে আটক করে লোহাগাড়া থানা-পুলিশের কাছে সোপর্দ করি।ওই ঘটনার পরই প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দীন ভূঁইয়া সুমনকে ‘ডেভিড জিহাদ’ পরিচয়ে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন প্রধান শিক্ষক।তিনি বলেন, একই দিন সন্ধ্যায় ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডেভিড জিহাদ পরিচয়ে আমাকে মোবাইলে হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি পার্শ্ববর্তী এলাকার এক যুবদল নেতাকে জানালে তিনি মোবাইল নম্বরটি শনাক্ত করতে সহায়তা করেন এবং জানান, ডেভিড জিহাদ মুসলিম উদ্দিনের অনুসারী।প্রধান শিক্ষকের দাবি, পরে রাতে থানায় গিয়ে তিনি দেখেন, যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিন সেখানে এসেছেন। সেখানে মুসলিম উদ্দিন তাকে মারধর করে প্রধান শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন।প্রধান শিক্ষক বলেন, তখনই জানতে পারি, ওই কিশোরগ্যাংরা মূলত তার অনুসারী।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় আটক কিশোরকে পরে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, তার পরিবারের সদস্য এবং রাজনৈতিক দলের কয়েকজন ব্যক্তির উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসা করে ছেড়ে দেওয়া হয়।লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক, আটক কিশোরের পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিরা বসে বিষয়টি সমাধান করার পর ভবিষ্যতে আর কোনো ঘটনা হবে না এমন মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া কোনো শিক্ষক বা ভুক্তভোগী মামলা না করলে আটক রাখার সুযোগও নেই।তবে ওই ঘটনার পর অল্প সময়ের ব্যবধানে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক হামলার শিকার হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।শিক্ষক নজরুল ইসলামের ওপর হামলার দিন বিকেল ৫টার দিকে যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ওই র্যালিতে ডেভিড জিহাদ প্রায় ১৫ জন অনুসারী নিয়ে অংশ নেন এবং মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন।স্থানীয়দের আরও দাবি, র্যালির প্রায় দুই ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে শিক্ষক নজরুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পর ডেভিড জিহাদসহ কয়েকজনকে ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে বলেও তারা দাবি করেন। এ বিষয়ে সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে ওই ফুটেজের সত্যতা ও ফুটেজে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।আহত শিক্ষক নজরুল ইসলামের ভাষ্য, তিনি তার বন্ধু মারওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে মা ও শিশু হাসপাতালের পেছন থেকে শহীদ মেজর নাজমুল হক সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় ৪ থেকে ৫ জন যুবক তাদের গতিরোধ করেন।নজরুল ইসলামের অভিযোগ, আমাদের একটা ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিস কেন এমন প্রশ্ন করে তারা ছুরি ও ক্ষুর নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।তিনি বলেন, হামলাকারীরা তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। একপর্যায়ে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, ডেভিড জিহাদকে বিভিন্ন সময় যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেখা গেছে। তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকেও মুসলিম উদ্দিনকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে বলে তারা জানান।স্থানীয়দের আরও দাবি, এর আগেও ডেভিড জিহাদ পরিচয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ওই হুমকির বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে বলে তারা জানান। তাদের অভিযোগ, এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় শিক্ষক নজরুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনায়ও ডেভিড জিহাদের সম্পৃক্ততার সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে এটি স্থানীয়দের অভিযোগ; পুলিশ এখনো ডেভিড জিহাদকে শিক্ষক হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে নিশ্চিত করেনি।লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মো. হোসাইন আল ইমরান জানান, আহত শিক্ষককে হাসপাতালে আনার পর তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ক্ষতস্থানগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ড্রেসিং ও সেলাই করা হয়েছে।লোহাগাড়া থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ওই মামলার একজন আসামিকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, প্রধান শিক্ষককে হুমকি এবং এর পরপরই এক শিক্ষককে প্রকাশ্য সড়কে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতের ঘটনায় লোহাগাড়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি কিশোরগ্যাংয়ের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে কেউ অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি উঠেছে।শিক্ষক হামলার সঙ্গে ডেভিড জিহাদের সম্পৃক্ততা, তার সঙ্গে কথিত কিশোরগ্যাংয়ের সম্পর্ক এবং যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত