প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
বান্দরবানের পাহাড়ের মাটি কক্সবাজারে!
বিশেষ প্রতিবেদক ||
বান্দরবানের
বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ও নদী-খালের
তীর কেটে অবৈধভাবে বালি
ও মাটি উত্তোলন করে
কক্সবাজারে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ফকিরাখোলাপাড়ায় এ কর্মকাণ্ডে ডুলাহাজারা
সাফারি পার্কের বনভূমি এবং স্থানীয় কৃষকদের
ফসলি জমিও কেটে নেওয়া
হচ্ছে। এতে খালের গতিপথ
পরিবর্তন, কৃষিজমি বিলীন, সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে
পড়া এবং পরিবেশ ও
জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাবের
আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।পাহাড়ধস
প্রতিরোধ, বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা
এবং পাহাড়ি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ
বজায় রাখতে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সরকার
ঘোষিত কোনো বালুমহাল নেই।
পাহাড়ি এলাকায় সব ধরনের পানির
উৎস থেকে বালি উত্তোলনও
নিষিদ্ধ। এরপরও বান্দরবানের বিভিন্ন নদী, ছড়া ও
খাল থেকে ড্রেজার দিয়ে
বালি তোলা এবং নদী-খালের তীরবর্তী জমি থেকে মাটি
কাটার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।সম্প্রতি
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের
ফকিরাখোলাপাড়ার বাসিন্দারা বালি উত্তোলন বন্ধে
জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ
দেন। এরপর সরেজমিনে দেখা
যায়, খালের পশ্চিম পাড়ে ডুলাহাজারা সাফারি
পার্কের বনভূমি কেটে মাটি নেওয়া
হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব পাড়ে কাটা হয়েছে
কৃষকদের ফসলি জমিও। বিভিন্ন
স্থানে বড় গর্ত তৈরি
হয়ে সেখানে পানি জমে আছে।স্থানীয়
বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় তিন বছর ধরে
৮ থেকে ১২টি ড্রেজার
দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালি উত্তোলন চলছে।
এতে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পাড় ভেঙে প্রায়
৭০ একর ফসলি জমি
বিলীন হয়েছে। বালি উত্তোলনের কারণে
ফকিরাখোলাপাড়ার একটি সেতু এবং
বান্দরবান-কক্সবাজার সীমান্তের হারগাজা খালের ওপর নির্মিত আরেকটি
সেতু দেবে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
হয়ে পড়েছে।স্থানীয়দের
অভিযোগ, অবৈধভাবে উত্তোলিত বালি ও মাটি
ট্রাকে করে কক্সবাজারের বিভিন্ন
এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ভিলেজারপাড়া, পাগলীর বিল ও ডুলাহাজারা
বাজার এলাকার বাসিন্দারা জানান, বর্ষায় প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪৫
ট্রাক এবং শুষ্ক মৌসুমে
২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক
বালি ও মাটি কক্সবাজারের
দিকে যায়।সরেজমিনে
ফকিরাখোলাপাড়া থেকে ডুলাহাজারা বাজারের
পথে ভিলেজারপাড়া ও পাগলীর বিল
এলাকায় সড়কের পাশে বিপুল পরিমাণ
বালি মজুদ করতে দেখা
গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি চক্র এসব উত্তোলন
ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত।অবৈধ
বালি উত্তোলন নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের
মধ্যেই গত ২৫ জুলাই
রাতে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের ইজারার টোল আদায় চৌকি
ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। টোল
ইজারাদার নুরুল আজিম এ ঘটনায়
লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ওসির
কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।
ইউনিয়নের ৩০টির বেশি স্থানে ড্রেজার দিয়ে বালি তোলা হচ্ছে। তার অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার পরও পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না এসব কর্মকাণ্ড। - মো. কুতুব উদ্দিন, প্যানেল চেয়ারম্যান, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নডুলাহাজারা
বিট কর্মকর্তা মো. শহরিয়ার বলেন,
সংরক্ষিত বনের ওই অংশ
বর্তমানে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের আওতাভুক্ত। তবে সেটি কবে
পার্কের আওতায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি
নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।ডুলাহাজারা
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলম
বলেন, পার্ক এলাকায় নিয়মিত টহল দেওয়া হয়।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
কর্মকর্তা নুর জাহান বলেন,
পার্কের আওতাভুক্ত এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো কাজের
ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে
না। এর আগে পার্কের
সীমানাপ্রাচীরসংলগ্ন এলাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে
প্রশাসনের সহায়তায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।ফাঁসিয়াখালী
ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. কুতুব উদ্দিন
বলেন, ইউনিয়নের ৩০টির বেশি স্থানে ড্রেজার
দিয়ে বালি তোলা হচ্ছে।
তার অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার পরও পুরোপুরি
বন্ধ করা যাচ্ছে না
এসব কর্মকাণ্ড।শুধু
ফাঁসিয়াখালী নয়, বান্দরবান সদর,
রুমা, নাইক্ষ্যংছড়ি ও থানচির সাঙ্গু
নদ এবং লামা ও
আলীকদমের মাতামুহুরী নদীর বিভিন্ন স্থানসহ
ছড়া ও খাল থেকেও
অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের অভিযোগ
রয়েছে।কক্সবাজারের
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান
বলেন, বান্দরবানের সীমান্তবর্তী হারগাজা খাল এবং সংশ্লিষ্ট
এলাকা থেকে বালি ও
মাটি কক্সবাজারে পাচারের বিষয়টি তার জানা নেই।
তবে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানাকে প্রয়োজনীয়
ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।বান্দরবান
জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস
বলেন, অবৈধ বালি উত্তোলনসহ
পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। ঘটনাস্থলগুলো
দূরবর্তী হওয়ায় পরিকল্পনা করে যথাযথ ব্যবস্থা
নেওয়া হবে এবং এসব
কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।পরিবেশ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় ও
নদীর তীর কেটে বালি-মাটি উত্তোলন অব্যাহত
থাকলে ভূমিক্ষয় ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি
বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে বর্ষায় আকস্মিক
বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি
তৈরি হতে পারে। বনভূমি
ও কৃষিজমি রক্ষার পাশাপাশি অবৈধ উত্তোলন ও
পরিবহন বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর আইন
প্রয়োগ জরুরি।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত