জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

গুরুত্ব পাচ্ছে গণপরিবহন

চট্টগ্রামের যানজট কমাতে ৩,৪০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা


গাজী গোফরান
গাজী গোফরান
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

চট্টগ্রামের যানজট কমাতে ৩,৪০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা

চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে শুধু সড়ক বাড়ানো বা নতুন সড়ক নির্মাণের প্রচলিত কৌশল থেকে সরে এসে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

আগামী ২৫ বছরের যোগাযোগ ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরিতে একটি খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের মতামত, আপত্তি ও অনুসন্ধানের জন্য এটি প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে মতামত দেওয়া যাবে।

মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম মহানগরীর পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।

সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে চট্টগ্রাম নগর ও সংলগ্ন এলাকায় দৈনিক যাতায়াত বা ট্রিপের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৭৪ লাখ ৩৮ হাজার। ২০৩০ সালে তা বেড়ে ৯২ লাখ ৮৮ হাজারে এবং ২০৪০ সালে ১ কোটি ২২ লাখে পৌঁছাতে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ দৈনিক মোট ট্রিপ ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৯ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে নগরীতে প্রায় ১ হাজার ১০০ বাস বিভিন্ন রুটে চলাচল করলেও পৃথক মালিকানা, একই পথে তীব্র প্রতিযোগিতা, ইচ্ছেমতো যাত্রী ওঠানামা এবং যত্রতত্র স্টপেজের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। এর সমাধান হিসেবে সিডিএ মাত্র ৭০০টি আধুনিক বাস দিয়ে একটি সুসংগঠিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছে।

এসব বাস নির্দিষ্ট সময়সূচি, আধুনিক অনলাইন ও ই-টিকিটিং ব্যবস্থা, বেতনভুক্ত চালক এবং পারফরম্যান্সভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালিত হবে।

পরিকল্পনায় ২০৫০ সালের মধ্যে গণপরিবহনে যাতায়াতের হার ২০২২ সালের ২১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আধুনিক বাস সংগ্রহ, নতুন ডিপো, টার্মিনাল, বাস-বে ও নির্ধারিত বাস স্টপেজ নির্মাণে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ও নিয়ন্ত্রিত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আরও ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।

এছাড়া মোট ৩৮৫ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৪ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার বিদ্যমান সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্ত করা হবে এবং ১৪০ দশমিক ৬ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করা হবে।

শহরের ৬৮টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রেলপথ ও নৌপথকে গণপরিবহনের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড ও পটিয়ার সঙ্গে দ্রুতগতির ‘কমিউটার ট্রেন’ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীতে নিয়মিত ওয়াটার বাস চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিবর্তে আপাতত বাস ও রেলব্যবস্থার আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কারণ, মেট্রোরেল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিকে অন্তত ১৮ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সিডিএ।

শহরের ওপর থেকে যানবাহনের চাপ কমাতে আনোয়ারা, পটিয়া, কর্ণফুলী, বোয়ালখালী, সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ও রাউজানে আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের জট কমাতে অন্তত ১০ হাজার ধারণক্ষমতার কয়েকটি বড় ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ‘এক শহর দুই নগর’ ধারণার মাধ্যমে আবাসন, শিক্ষা ও শিল্পকেন্দ্র শহরের বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও গতিশীল করার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


চট্টগ্রামের যানজট কমাতে ৩,৪০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা

প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে শুধু সড়ক বাড়ানো বা নতুন সড়ক নির্মাণের প্রচলিত কৌশল থেকে সরে এসে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

আগামী ২৫ বছরের যোগাযোগ ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরিতে একটি খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের মতামত, আপত্তি ও অনুসন্ধানের জন্য এটি প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে মতামত দেওয়া যাবে।

মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম মহানগরীর পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।

সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে চট্টগ্রাম নগর ও সংলগ্ন এলাকায় দৈনিক যাতায়াত বা ট্রিপের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৭৪ লাখ ৩৮ হাজার। ২০৩০ সালে তা বেড়ে ৯২ লাখ ৮৮ হাজারে এবং ২০৪০ সালে ১ কোটি ২২ লাখে পৌঁছাতে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ দৈনিক মোট ট্রিপ ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৯ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে নগরীতে প্রায় ১ হাজার ১০০ বাস বিভিন্ন রুটে চলাচল করলেও পৃথক মালিকানা, একই পথে তীব্র প্রতিযোগিতা, ইচ্ছেমতো যাত্রী ওঠানামা এবং যত্রতত্র স্টপেজের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। এর সমাধান হিসেবে সিডিএ মাত্র ৭০০টি আধুনিক বাস দিয়ে একটি সুসংগঠিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছে।

এসব বাস নির্দিষ্ট সময়সূচি, আধুনিক অনলাইন ও ই-টিকিটিং ব্যবস্থা, বেতনভুক্ত চালক এবং পারফরম্যান্সভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালিত হবে।

পরিকল্পনায় ২০৫০ সালের মধ্যে গণপরিবহনে যাতায়াতের হার ২০২২ সালের ২১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আধুনিক বাস সংগ্রহ, নতুন ডিপো, টার্মিনাল, বাস-বে ও নির্ধারিত বাস স্টপেজ নির্মাণে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ও নিয়ন্ত্রিত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আরও ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।

এছাড়া মোট ৩৮৫ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৪ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার বিদ্যমান সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্ত করা হবে এবং ১৪০ দশমিক ৬ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করা হবে।

শহরের ৬৮টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রেলপথ ও নৌপথকে গণপরিবহনের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড ও পটিয়ার সঙ্গে দ্রুতগতির ‘কমিউটার ট্রেন’ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীতে নিয়মিত ওয়াটার বাস চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিবর্তে আপাতত বাস ও রেলব্যবস্থার আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কারণ, মেট্রোরেল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিকে অন্তত ১৮ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সিডিএ।

শহরের ওপর থেকে যানবাহনের চাপ কমাতে আনোয়ারা, পটিয়া, কর্ণফুলী, বোয়ালখালী, সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ও রাউজানে আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের জট কমাতে অন্তত ১০ হাজার ধারণক্ষমতার কয়েকটি বড় ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ‘এক শহর দুই নগর’ ধারণার মাধ্যমে আবাসন, শিক্ষা ও শিল্পকেন্দ্র শহরের বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও গতিশীল করার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।


জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত