২২ লাখের ভবন ৩ বছরেই ভাঙা, বিক্রি মাত্র ১ লাখে!
নাটোরের গুরুদাসপুরে সরকারি অর্থায়নে প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ব্যবহার উপযোগী বিদ্যালয় ভবন মাত্র তিন বছরের মাথায় ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ধানুড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জাইকার অর্থায়নে নির্মিত ওই ভবনটি ভেঙে এর ইট, রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী প্রায় এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের পুরোনো একটি আধাপাকা ভবনও ভেঙে ফেলা হয়েছে।অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো—ভবন দুটি ভাঙার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এমনকি যে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য পুরোনো ভবন দুটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে, সেই নতুন ভবনের অনুমোদনও এসেছে ভবন ভাঙার পরে। এ ঘটনায় সরকারি অর্থে নির্মিত ব্যবহারযোগ্য একটি ভবন এত অল্প সময়ে কেন ভাঙা হলো এবং বিক্রি করা নির্মাণসামগ্রীর অর্থ কোথায় গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে ধানুড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে একতলা দুটি ভবন ও দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্প (ইউজিডিপি) এবং জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫২ টাকা ব্যয়ে একটি একতলা ভবন নির্মাণ করে।২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভবনটি উদ্বোধন করা হয়। নির্মাণের পর সেখানে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমও চলছিল। কিন্তু উদ্বোধনের মাত্র তিন বছর পর চলতি বছরের জুন-জুলাইয়ে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। একই সময়ে বিদ্যালয়ের পুরোনো একটি আধাপাকা ভবনও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।সরেজমিনে ধানুড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, জাইকার অর্থায়নে নির্মিত একতলা ভবনটির কোনো অস্তিত্ব নেই। ভবনের বীমের কিছু অংশ খনন করে তুলে নেওয়া হয়েছে। সেখানে এখন গর্ত পড়ে আছে। পুরোনো আধাপাকা ভবনটিরও কোনো চিহ্ন নেই।ভবন দুটির ইট, রড, দরজা-জানালা কিংবা অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীও বিদ্যালয় চত্বরে দেখা যায়নি। বর্তমানে বিদ্যালয়ের অন্য ভবনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে।এক লাখ টাকায় বিক্রি!প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসেনের দাবি, বিদ্যালয়ে জায়গার সংকট থাকায় নতুন ভবন নির্মাণের জন্য পুরোনো ভবন দুটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভবন দুটির ইট, রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী দরদাতার মাধ্যমে প্রায় এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। তবে ওই টাকা বিদ্যালয়ের হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। বিক্রির অর্থ জমা দেওয়ার নথিও দেখাতে পারেননি প্রধান শিক্ষক।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রায় দুই মাস ধরে শ্রমিক দিয়ে ভবন দুটি ভাঙার কাজ চলে। ভবন ভাঙার সময় মাইকিং করা হয়েছিল বলেও তারা জানান। তবে ভবন ভাঙার আগে সরকারি অনুমোদন বা নিলামসংক্রান্ত কোনো প্রক্রিয়া সম্পর্কে তারা কিছু জানতেন না।তাদের প্রশ্ন, প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ভবন মাত্র তিন বছরেই কেন ভেঙে ফেলতে হলো? ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি ভবনের নির্মাণসামগ্রী বিক্রির এক লাখ টাকা কোথায় গেল, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।বিদ্যালয়ের বর্তমান এডহক কমিটির সভাপতি রনি আহমেদ বলেন, তিনি দেড় থেকে দুই মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন। ভবন ভাঙা ও নির্মাণসামগ্রী বিক্রির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশও তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ভবন ভাঙা ও বিক্রির বিষয়টির দায়দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের।বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মোতালেব হোসেন বলেন, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বিদ্যালয়ের জায়গা মাপজোক নিয়ে সভা হয়েছিল। তবে পুরোনো ভবন ভাঙা, নির্মাণসামগ্রী কত টাকায় বিক্রি হয়েছে এবং সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে—এসব বিষয়ে প্রধান শিক্ষকই বলতে পারবেন।অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ে জায়গার সংকট রয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য আগের একতলা ভবন ও পুরোনো আধাপাকা ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।তিনি জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজের সহায়তায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে চারতলা ভিতবিশিষ্ট একতলা একাডেমিক ভবনের অনুমোদন পাওয়া গেছে। গত ২৬ আগস্ট নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।তবে ভবন ভাঙার আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি—এ কথা স্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক।তার ভাষ্য, নতুন ভবনের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে সময় স্বল্পতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ভবন ভাঙার অনুমোদন নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে মাইকিং করে দরদাতার মাধ্যমে ভবন দুটির নির্মাণসামগ্রী প্রায় এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির রেজুলেশন রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে রেজুলেশন কিংবা নির্মাণসামগ্রী বিক্রির অর্থ বিদ্যালয়ের হিসাবে জমা দেওয়ার কোনো নথি তিনি দেখাতে পারেননি।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবন ভাঙার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন, এলজিইডি ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। নতুন ভবনের অনুমোদন পাওয়ার আগেই পুরোনো ভবন দুটি ভেঙে ফেলা হয়।পরে ২৩ আগস্ট নতুন ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর তিন দিন পর ২৬ আগস্ট সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউজিডিপি) কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার বলেন, ২০২৩ সালে ধানুড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫২ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছিল। ভবনটি ভেঙে ফেলার বিষয়ে তাদের কিছু জানানো হয়নি। সাংবাদিকদের মাধ্যমে তারা বিষয়টি জানতে পেরেছেন।তিনি বলেন, সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।গুরুদাসপুর উপজেলা প্রকৌশলী মিলন মিয়া বলেন, নারী শিক্ষা প্রসারের বিষয়টি বিবেচনায় উপজেলা পরিষদের সুপারিশে জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্প্রতি ভবনটি ভেঙে বিক্রি করার বিষয়টি তারা জানতে পেরেছেন। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে প্রধান শিক্ষক ভবনটি ভেঙে বিক্রি করেছেন। ভবন ভাঙার আগে উপজেলা প্রশাসনের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এ ঘটনায় প্রধান শিক্ষককে কৈফিয়ত তলব করে চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।উঠছে নানা প্রশ্ন সরকারি অর্থায়নে নির্মিত একটি ব্যবহার উপযোগী ভবন মাত্র তিন বছরের মাথায় ভেঙে ফেলা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানানো এবং নতুন ভবনের অনুমোদনের আগেই পুরোনো ভবন অপসারণের ঘটনায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।স্থানীয়দের দাবি, ভবনটি কেন ভাঙা হলো, ভবনটি আদৌ ব্যবহার অনুপযোগী হয়েছিল কি না, কার অনুমোদনে ভাঙা হলো, নির্মাণসামগ্রী কী প্রক্রিয়ায় বিক্রি করা হয়েছে এবং বিক্রির অর্থ বিদ্যালয়ের হিসাবে জমা হয়েছে কি না এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।তাদের মতে, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি ভবন মাত্র তিন বছর পর ভেঙে ফেলার ঘটনায় শুধু দায় নির্ধারণ নয়, ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।