জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

চট্টগ্রামে এখনো লাগামহীন হামে ঝরছে কচি প্রাণ!



চট্টগ্রামে এখনো লাগামহীন হামে ঝরছে কচি প্রাণ!

বন্দরনগরী চট্টগ্রামজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে হামের দাপট। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার বহু মাস পার হলেও পরিস্থিতির ন্যূনতম কোনো উন্নতি দৃশ্যমান নয়। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই গড়ে পঞ্চাশের বেশি শিশু তীব্র হাম ও তৎসংশ্লিষ্ট শারীরিক জটিলতা নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রতিনিয়ত একাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটলেও পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষার অভাবকে ঢাল বানিয়ে সুনির্দিষ্ট মৃত্যুর কারণ খোলাসা করছেন না স্বাস্থ্য দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার বাইরে থেকে যাওয়া এই বিপুল সংখ্যক রোগীর বড় একটি অংশই মূলত হাম এবং পরবর্তী জটিলতায় প্রাণ হারাচ্ছে, যা সরকারি খাতায় কোনো হিসাব হিসেবেই থেকে যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই অঞ্চলে হামের প্রকোপ ছড়াতে শুরু করে। এরপর থেকে গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বমোট দশ হাজার ৩৭৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। সরকারি হিসেবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১০ হাজার ৪৪ জন এবং ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৮৩৭ জনের শরীরে। স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যানে উপসর্গ নিয়ে ২৯ জন শিশুর প্রাণহানির কথা স্বীকার করা হলেও নমুনা পরীক্ষা ইতিবাচক আসার ভিত্তিতে নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩ জন। উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৯ জন। অথচ চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকেরা জোর দিয়ে বলছেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সিংহভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই কোনো প্রকার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। ফলে মৃত্যুর এই সরকারি হিসাব এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিশাল এক ফারাক থেকে যাচ্ছে।


 


বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুমাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সার্বিক চিত্র অত্যন্ত নাজুক। হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ব্লকে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও সেবিকা বৃন্দ। শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর চাপ বহুগুণ বেশি থাকায় অনেক শিশুকে সাধারণ ওয়ার্ডের মেঝেতে কিংবা অন্য শিশুদের পাশাপাশি রেখে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। এয়ারবোর্ন বা বায়ুবাহিত এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের সাধারণ ওয়ার্ডে রাখার ফলে উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে মারাত্মক এক স্বাস্থ্যঝাঁকি। হাসপাতালে অন্য কোনো সাধারণ ব্যাধি নিয়ে ভর্তি হয়ে সুস্থ হওয়ার পর আবারও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়ার মতো আশঙ্কাজনক ঘটনা অহরহই ঘটছে। এতে করে চিকিৎসাধীন সুস্থ কিংবা ভিন্ন রোগে ভোগা অন্য শিশুদের শরীরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে হামের ভাইরাস। এহেন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দাবি, হাসপাতালে ভর্তি সাধারণ শিশুদের সুরক্ষার স্বার্থে অনতিবিলম্ব চট্টগ্রামজুড়ে হাম রোগীদের জন্য পৃথক ডেডিকেটেড হাসপাতাল বা অন্তর্বর্তীকালীন আইসোলেশন কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি।


 


চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হাম মূলত ভাইরাসজনিত এক অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি ও বাতাসের মাধ্যমে অতি দ্রুত চারপাশের মানুষের মধ্যে বিস্তার লাভ করে। সংক্রমিত হওয়ার পর শিশুর শরীরে তীব্র জ্বর, সর্দি, অনবরত কাশি এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এর কিছুদিন পর সারা শরীরে লালচে রঙের ছোট ছোট ফুসকুড়ি বা র‌্যাশ উদয় হয়। শিশুরা এই ভাইরাসের প্রধান শিকারে পরিণত হয় এবং রোগের তীব্রতা বাড়লে সবচেয়ে মারাত্মক যে জটিলতাটি তৈরি হয়, তা হলো নিউমোনিয়া। চিকিৎসকেরা বলছেন, হাম নিজেই ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়, যার সুযোগে গৌণ বা সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ ঘটে নিউমোনিয়া রূপ নেয়। উপযুক্ত সময়ে এমএমআর বা পরিপূরক হাম-রুবেলা টিকা প্রদানই এই ভাইরাসের শৃঙ্খল ভাঙার প্রধানতম হাতিয়ার। তবে পুষ্টিহীনতা ও ভিটামিন 'এ'-এর ঘাটতি না থাকলে আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই সাধারণ পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে ওঠে।


 


সম্প্রতি চট্টগ্রাম অঞ্চলের হাম আক্রান্ত শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে মহামারী বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকদের জন্য গভীর চিন্তার মতো কিছু তথ্য। ওই গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত মোট শিশুর প্রায় ৪৬ শতাংশের বয়সই ছিল ৯ মাসের নিচে। অথচ আমাদের দেশে প্রচলিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী ৯ মাস বয়সে পৌঁছানোর পর শিশুদের হামের প্রথম ডোজ প্রদান করা হয়। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, টিকা পাওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর পূর্বেই এক বিশাল সংখ্যক শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে, যা গোটা টিকাদান কৌশল নিয়েই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া আক্রান্ত শিশুদের বয়স ২ মাস থেকে শুরু করে ১১ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের প্রায় ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুই প্রত্যন্ত বা গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা এবং ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু নিম্ন বিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারের সদস্য। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে ৩১ শতাংশ শিশু তীব্র বা একিউট পুষ্টিহীনতার শিকার, যা তাদের শারীরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা একদম ভেঙে দিয়েছিল।


 


টিকা না নেওয়ার পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে যে সামাজিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার তথ্য সামনে এসেছে, তা আরও হতাশাজনক। টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা কিংবা টিকাদানের নির্ধারিত তারিখ ভুলে যাওয়াকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ৩০ শতাংশ শিশু অন্য কোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভোগার কারণে সময়মতো টিকা পায় নি, ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে মায়ের শারীরিক অসুস্থতার জন্য শিশুকে কেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হয়নি, ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ইনজেকশনের ভয় এবং বাকি ৪ শতাংশ পরিবার টিকা কার্ড হারিয়ে ফেলার কারণে সন্তানকে টিকা দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি এবং ফলো-আপ কার্যক্রম কতটা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।


 


চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বিদ্যমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, হামের প্রাদুর্ভাব এখনো কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। দিন যতই যাচ্ছে, নতুন নতুন উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। হাসপাতালে আসা রোগীদের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এদের মধ্যে যেমন একেবারে টিকা না নেওয়া শিশু রয়েছে, তেমনি এক ডোজ টিকা দেওয়া কিংবা সম্পূর্ণ টিকাদান শেষ করা শিশুকেও হামের উপসর্গ নিয়ে শয্যাশায়ী হতে দেখা যাচ্ছে।


 


সার্বিক দিক বিবেচনায় চিকিৎসকেরা অবশ্য সাধারণ অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যেসব শিশু নিয়মিত মায়ের দুধ পান করে এবং যাদের দেহে পর্যাপ্ত ভিটামিন 'এ' রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ বড় কোনো বিপদের সৃষ্টি করে না। মূলত অপুষ্ট ও পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুদের শরীরেই হামের পর নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিৎসকদের কঠোর নির্দেশনা হলো, কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে কফ, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীরে লালচে গুটি দেখা দিলে ঘরে বসে না থেকে বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর ভরসা না করে কাল বিলম্ব না করে নিকটস্থ হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা বা আইসোলেশনে রাখা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় পুরো পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও এই সংক্রমণ তাণ্ডব চালাতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


চট্টগ্রামে এখনো লাগামহীন হামে ঝরছে কচি প্রাণ!

প্রকাশের তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বন্দরনগরী চট্টগ্রামজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে হামের দাপট। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার বহু মাস পার হলেও পরিস্থিতির ন্যূনতম কোনো উন্নতি দৃশ্যমান নয়। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই গড়ে পঞ্চাশের বেশি শিশু তীব্র হাম ও তৎসংশ্লিষ্ট শারীরিক জটিলতা নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রতিনিয়ত একাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটলেও পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষার অভাবকে ঢাল বানিয়ে সুনির্দিষ্ট মৃত্যুর কারণ খোলাসা করছেন না স্বাস্থ্য দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার বাইরে থেকে যাওয়া এই বিপুল সংখ্যক রোগীর বড় একটি অংশই মূলত হাম এবং পরবর্তী জটিলতায় প্রাণ হারাচ্ছে, যা সরকারি খাতায় কোনো হিসাব হিসেবেই থেকে যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই অঞ্চলে হামের প্রকোপ ছড়াতে শুরু করে। এরপর থেকে গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বমোট দশ হাজার ৩৭৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। সরকারি হিসেবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১০ হাজার ৪৪ জন এবং ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৮৩৭ জনের শরীরে। স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যানে উপসর্গ নিয়ে ২৯ জন শিশুর প্রাণহানির কথা স্বীকার করা হলেও নমুনা পরীক্ষা ইতিবাচক আসার ভিত্তিতে নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩ জন। উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৯ জন। অথচ চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকেরা জোর দিয়ে বলছেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সিংহভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই কোনো প্রকার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। ফলে মৃত্যুর এই সরকারি হিসাব এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিশাল এক ফারাক থেকে যাচ্ছে।


 


বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুমাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সার্বিক চিত্র অত্যন্ত নাজুক। হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ব্লকে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও সেবিকা বৃন্দ। শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর চাপ বহুগুণ বেশি থাকায় অনেক শিশুকে সাধারণ ওয়ার্ডের মেঝেতে কিংবা অন্য শিশুদের পাশাপাশি রেখে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। এয়ারবোর্ন বা বায়ুবাহিত এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের সাধারণ ওয়ার্ডে রাখার ফলে উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে মারাত্মক এক স্বাস্থ্যঝাঁকি। হাসপাতালে অন্য কোনো সাধারণ ব্যাধি নিয়ে ভর্তি হয়ে সুস্থ হওয়ার পর আবারও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়ার মতো আশঙ্কাজনক ঘটনা অহরহই ঘটছে। এতে করে চিকিৎসাধীন সুস্থ কিংবা ভিন্ন রোগে ভোগা অন্য শিশুদের শরীরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে হামের ভাইরাস। এহেন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দাবি, হাসপাতালে ভর্তি সাধারণ শিশুদের সুরক্ষার স্বার্থে অনতিবিলম্ব চট্টগ্রামজুড়ে হাম রোগীদের জন্য পৃথক ডেডিকেটেড হাসপাতাল বা অন্তর্বর্তীকালীন আইসোলেশন কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি।


 


চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হাম মূলত ভাইরাসজনিত এক অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি ও বাতাসের মাধ্যমে অতি দ্রুত চারপাশের মানুষের মধ্যে বিস্তার লাভ করে। সংক্রমিত হওয়ার পর শিশুর শরীরে তীব্র জ্বর, সর্দি, অনবরত কাশি এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এর কিছুদিন পর সারা শরীরে লালচে রঙের ছোট ছোট ফুসকুড়ি বা র‌্যাশ উদয় হয়। শিশুরা এই ভাইরাসের প্রধান শিকারে পরিণত হয় এবং রোগের তীব্রতা বাড়লে সবচেয়ে মারাত্মক যে জটিলতাটি তৈরি হয়, তা হলো নিউমোনিয়া। চিকিৎসকেরা বলছেন, হাম নিজেই ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়, যার সুযোগে গৌণ বা সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ ঘটে নিউমোনিয়া রূপ নেয়। উপযুক্ত সময়ে এমএমআর বা পরিপূরক হাম-রুবেলা টিকা প্রদানই এই ভাইরাসের শৃঙ্খল ভাঙার প্রধানতম হাতিয়ার। তবে পুষ্টিহীনতা ও ভিটামিন 'এ'-এর ঘাটতি না থাকলে আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই সাধারণ পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে ওঠে।


 


সম্প্রতি চট্টগ্রাম অঞ্চলের হাম আক্রান্ত শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে মহামারী বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকদের জন্য গভীর চিন্তার মতো কিছু তথ্য। ওই গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত মোট শিশুর প্রায় ৪৬ শতাংশের বয়সই ছিল ৯ মাসের নিচে। অথচ আমাদের দেশে প্রচলিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী ৯ মাস বয়সে পৌঁছানোর পর শিশুদের হামের প্রথম ডোজ প্রদান করা হয়। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, টিকা পাওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর পূর্বেই এক বিশাল সংখ্যক শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে, যা গোটা টিকাদান কৌশল নিয়েই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া আক্রান্ত শিশুদের বয়স ২ মাস থেকে শুরু করে ১১ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের প্রায় ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুই প্রত্যন্ত বা গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা এবং ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু নিম্ন বিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারের সদস্য। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে ৩১ শতাংশ শিশু তীব্র বা একিউট পুষ্টিহীনতার শিকার, যা তাদের শারীরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা একদম ভেঙে দিয়েছিল।


 


টিকা না নেওয়ার পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে যে সামাজিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার তথ্য সামনে এসেছে, তা আরও হতাশাজনক। টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা কিংবা টিকাদানের নির্ধারিত তারিখ ভুলে যাওয়াকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ৩০ শতাংশ শিশু অন্য কোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভোগার কারণে সময়মতো টিকা পায় নি, ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে মায়ের শারীরিক অসুস্থতার জন্য শিশুকে কেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হয়নি, ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ইনজেকশনের ভয় এবং বাকি ৪ শতাংশ পরিবার টিকা কার্ড হারিয়ে ফেলার কারণে সন্তানকে টিকা দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি এবং ফলো-আপ কার্যক্রম কতটা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।


 


চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বিদ্যমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, হামের প্রাদুর্ভাব এখনো কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। দিন যতই যাচ্ছে, নতুন নতুন উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। হাসপাতালে আসা রোগীদের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এদের মধ্যে যেমন একেবারে টিকা না নেওয়া শিশু রয়েছে, তেমনি এক ডোজ টিকা দেওয়া কিংবা সম্পূর্ণ টিকাদান শেষ করা শিশুকেও হামের উপসর্গ নিয়ে শয্যাশায়ী হতে দেখা যাচ্ছে।


 


সার্বিক দিক বিবেচনায় চিকিৎসকেরা অবশ্য সাধারণ অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যেসব শিশু নিয়মিত মায়ের দুধ পান করে এবং যাদের দেহে পর্যাপ্ত ভিটামিন 'এ' রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ বড় কোনো বিপদের সৃষ্টি করে না। মূলত অপুষ্ট ও পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুদের শরীরেই হামের পর নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিৎসকদের কঠোর নির্দেশনা হলো, কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে কফ, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীরে লালচে গুটি দেখা দিলে ঘরে বসে না থেকে বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর ভরসা না করে কাল বিলম্ব না করে নিকটস্থ হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা বা আইসোলেশনে রাখা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় পুরো পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও এই সংক্রমণ তাণ্ডব চালাতে পারে।


জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত