জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

ময়লার স্তূপ থেকেই বিদ্যুৎ-গ্যাস তৈরির সম্ভাবনা

আবর্জনা আর শুধু বোঝা হয়ে থাকবে না। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে বর্জ্য থেকেই তৈরি হতে পারে সার, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ। প্লাস্টিক, কাগজ ও ধাতবসহ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য রিসাইক্লিং করে তৈরি হতে পারে অর্থনৈতিক মূল্য। একই সঙ্গে কমতে পারে পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্যঝুঁকি ও খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলার প্রবণতা। এমন সম্ভাবনাকে সামনে রেখে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং এলাকায় সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসোর্স রিকভারি প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উখিয়ার ক্রমবর্ধমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয়দের চাপে উখিয়ায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। বিশেষ করে কুতুপালং-বালুখালী সহ প্রত্যেক এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দিন দিন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা না হলে এসব বর্জ্য খোলা জায়গা, নালা-নর্দমা ও আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি মাটি-পানি দূষণ, দুর্গন্ধ, মশা-মাছির বিস্তার ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারণা,প্রস্তাবিত প্লান্ট চালু হলে বর্জ্যের জৈব অংশ আলাদা করে কম্পোস্ট বা জৈব সার উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে পঁচনশীল বর্জ্য পরিবেশের জন্য সমস্যা না হয়ে কৃষি ও বাগান ব্যবস্থাপনার উপকরণে পরিণত হতে পারে।স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জৈব সার ব্যবহার বাড়লে কৃষকদের জন্য নতুন একটি উপকরণের উৎস তৈরি হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ কমিয়ে তা থেকে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে,আরেকটি সম্ভাবনা হলো বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। প্লাস্টিকসহ উপযুক্ত বর্জ্য নির্দিষ্ট প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জৈব বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে।তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ বা জ্বালানি উৎপাদন হবে, তা নির্ভর করবে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, বর্জ্যের পরিমাণ ও ধরন এবং প্লান্টের নির্ধারিত সক্ষমতার ওপর। প্রকল্প চালু হলে বর্জ্য বাছাইয়ের মাধ্যমে প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতব ও অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী আলাদা করা সম্ভব হবে। এসব উপাদান রিসাইক্লিং করে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা গেলে বর্জ্য থেকে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হবে। অর্থাৎ, বর্তমানে যে বর্জ্য অপসারণের জন্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, ভবিষ্যতে তার একটি অংশ থেকেই আয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।সচেতন মহল বলছে, প্লান্ট চালু হলে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, বাছাই, রিসাইক্লিং, কম্পোস্ট উৎপাদন, প্লান্ট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।পাশাপাশি বর্জ্য থেকে উৎপাদিত সার, রিসাইক্লিং পণ্য ও অন্যান্য উপকরণকে ঘিরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় ব্যবসার নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।পরিবেশের জন্য দূষণ কমাতে প্রকল্পটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে জানিয়ে পরিবেশবাদীরা জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর বর্জ্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় এলে খোলা জায়গায় ময়লা ফেলার প্রবণতা কমতে পারে। নালা-নর্দমায় বর্জ্য জমে জলাবদ্ধতা এবং বর্জ্য থেকে মাটি ও পানি দূষণের ঝুঁকিও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বন, পাহাড়ি ছড়া, জলাধার ও বসতিপূর্ণ এলাকার ওপর বর্জ্যের চাপ কমবে। দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং বর্জ্যজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে প্রকল্পটি।জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে শুধু প্লান্ট নির্মাণই যথেষ্ট নয়। প্রকল্প চালুর পর বাড়ি, বাজার ও ক্যাম্প থেকেই জৈব, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নিরাপদ পরিবহন, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উৎপাদিত সার, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও রিসাইক্লিং পণ্যের বাজার নিশ্চিত করতে হবে।উখিয়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী জিএম মুক্তাদির বলেন,"প্রথমত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে বাসা বাড়ি বা হোটেল কিংবা পথেঘাটের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যেখানে বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে সেখান থেকে বর্জ্যগুলা সংগ্রহ করে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সার উৎপন্ন করা হবে। এছাড়াও প্লাস্টিকগুলো পাইরোলাইসিস ও গ্যাসফিকেশন সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পরিবেশ দূষণ হ্রাসের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদী।"উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, এটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্প। কুতুপালং যেখানে এমপি মহোদয় সহ যে স্থান দেখে আসা হয়েছে সেখানেই বাস্তবায়ন করার পর উনারা মেইনটেইনেন্সের জন্য আমাদেরকে হস্তান্তর করবে।সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন ও পরিচালিত হলে কুতুপালংয়ের এই প্রকল্প উখিয়ার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তখন ময়লা শুধু ফেলার বস্তু থাকবে না,বর্জ্যই হয়ে উঠতে পারে সার, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও আয়ের উৎস।

ময়লার স্তূপ থেকেই বিদ্যুৎ-গ্যাস তৈরির সম্ভাবনা