জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

পর্ব—১ : দুদকের মামলাও নস্যি; পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে

নিরাপত্তার জহিরুলের হাতেই অনিরাপদ রেল



নিরাপত্তার জহিরুলের হাতেই অনিরাপদ রেল

অনিয়ম, অনৈতিক অর্থ লেনদেন, প্রশাসনিক কাঠামোর যথেচ্ছ অপব্যবহার, নির্দিষ্ট ক্যাডারে বিপুল অংকের মাসোহারা আদায়, নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি থেকে শুরু করে ক্ষমতার অসীম দাপটে অঢেল ও দৃশ্যমান সম্পদ অর্জনের এক নজিরবিহীন মহোৎসব চলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি)। 

আর এই বিশৃঙ্খলা, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং পুরো অপকর্ম সিন্ডিকেটের নেপথ্য মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সরাসরি আঙুল উঠেছে বাহিনীটির চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের দিকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের গুরুতর মামলা, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তীব্র অসন্তোষ, অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং একের পর এক দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর দালিলিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসার পরও এক অলৌকিক ও রহস্যজনক শক্তিবলে তিনি নিজের আসনেই বহাল তবিয়তে অবস্থান করছেন। প্রশাসনিক শাস্তির তোয়াক্কা না করে এই বিতর্কিত কর্মকর্তা যেভাবে তাঁর ক্ষমতার রাজত্ব বজায় রেখেছেন, তাতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা, নিরবতা ও নীরব প্রশ্রয় নিয়ে পুরো রেল অঙ্গনে এখন তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

রেল পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব যাঁর ওপর ন্যস্ত, সেই জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে তা সাধারণ প্রশাসনিক অনিয়মের সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদে ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সংশোধিত নির্দেশিকা এবং দপ্তরাদেশ জারি করা হয়েছিল। সেই দপ্তরাদেশ অনুযায়ী, গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত কর্মচারীদের আন্তঃজোনাল অর্থাৎ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বদলির ক্ষেত্রে সরাসরি মহাপরিচালকের অনুশাসন ও অনুমোদন বাধ্যতামূলক ছিল এবং এই সংক্রান্ত অফিস আদেশও ডিজি কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে নির্গত হওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। অন্যদিকে, একই বিভাগের অভ্যন্তরীণ পদায়ন বা বদলির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বা জোনের মহাব্যবস্থাপকের লিখিত প্রশাসনিক সম্মতি প্রয়োজন হতো। কিন্তু বাস্তবে এই সমস্ত নির্দেশিকা কেবল লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, জহিরুল ইসলাম প্রশাসনিক এই সমস্ত আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে নিজের একক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। কোথাও কোথাও জোনাল মহাব্যবস্থাপক কিংবা মহাপরিচালকের নাম অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে ব্যাকডেটেড বা বেনামী আদেশের মাধ্যমে নিজস্ব অনুগত সদস্যদের সুবিধাজনক স্থানে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। বাহিনীর সদস্যদের জোরালো দাবি, গত কয়েক বছরের নোটশিট, বদলি সংক্রান্ত ফাইল ও অনুমোদনের নথি নিরপেক্ষ কোনো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন দিয়ে পর্যালোচনা করলেই এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মূল চিত্র উন্মোচিত হতে পারে।

এই বদলি ও পদায়নকে ঘিরে আরএনবির অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে এক অনৈতিক অর্থনীতির অদৃশ্য বলয়। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সদস্যদের সুনির্দিষ্ট তথ্যমতে, চিফ কমান্ড্যান্টের কাছে প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী বা উপরমহলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পৌঁছাতে পারলেই হাবিলদার, চিফ ইন্সপেক্টর কিংবা সাধারণ সিপাহীরা তাঁদের পছন্দের ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক স্থানে বদলি হতে পারেন। শুধুই বদলির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ পকেটস্থ করা নয়, বরং অর্থ গ্রহণের পর অন্য কারও কাছ থেকে আরও মোটা অঙ্কের অফার পেলে পূর্বের সদস্যকে প্রতারিত করে বেশি দরদাতাকে সেই পদে বসিয়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগও উঠেছে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাহিনীর এক ক্ষুব্ধ ইন্সপেক্টর অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান, কাঙ্ক্ষিত স্থানে বদলির স্পষ্ট আশ্বাস দিয়ে চিফ কমান্ড্যান্ট নিজে তাঁর কাছ থেকে নগদ দুই লাখ টাকা গ্রহণ করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে উপরমহলের রাজনৈতিক প্রভাব এবং অন্য এক প্রার্থীর কাছ থেকে আরও অধিক পরিমাণ অনৈতিক অর্থ পাওয়ার লোভে সেই পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাতিল করে অন্য সদস্যকে সেখানে পদায়ন করা হয়। এমনকি অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা সেই ইন্সপেক্টরকে নির্ধারিত স্থানে বদলি তো করা হয়ইনি, বরং তাঁর কষ্টার্জিত দুই লাখ টাকাও আর ফেরত দেওয়া হয়নি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল নিরাপত্তা বাহিনীর চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের অস্ত্র শাখা, জেনারেল শাখা, গোয়েন্দা শাখা, চট্টগ্রাম গুড পোর্ট ইয়ার্ড সহ বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল সার্কেলের আওতাধীন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা, ডিউটি বণ্টনে চরম স্বজনপ্রীতি, ভুয়া টি/এ ও ডি/এ বিল-ভাউচার প্রস্তুতকরণ, কোনো ডিউটি না করেই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার অনৈতিক প্রথা তথা কথিত ‘ভগবান ডিউটি’ এবং টিকিট কালোবাজারিসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চাঙ্গা রয়েছে। এই সমস্ত অবৈধ ও অনৈতিক খাত থেকে প্রতিটি সার্কেলে প্রতি মাসে আদায় হয় বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ, যা পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট অবৈধ ফান্ডে জমা হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এই অবৈধ অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী কমান্ড্যান্ট, কমান্ড্যান্ট, কমান্ড্যান্ট সদর এবং চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামের কাছে বাধ্যবাধকতার সাথে পৌঁছে দিতে হয়। কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা ও প্রভাব অনুযায়ী এই অবৈধ চাঁদার হার শতকরা ৫ ভাগ থেকে শুরু করে ২০ ভাগ পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, কোনো সার্কেলে সদ্য পোস্টিং পাওয়া কোনো হাবিলদার কিংবা ইন্সপেক্টর যদি এই অনৈতিক চাঁদা আদায়ে অস্বীকৃতি জানান বা সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাঁদাবাজি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তবে তাঁকে অনতিবিলম্বে শাস্তিমূলক বদলি করে দুর্গম বা গুরুত্বহীন স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে যিনি নিয়মিত এই অবৈধ মাসোহারা বা চাঁদার টাকা সদর দপ্তরে পৌঁছাতে পারেন এবং অর্থের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে পারেন, তাঁকেই পুরস্কৃত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত দায়িত্বে পদায়ন করা হয়। অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একের পর এক এমন ঘটনায় বাধ্য হয়ে সৎ ও নীতিবান কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াচ্ছেন। জানা গেছে, জহিরুল ইসলাম পূর্বাঞ্চলে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিগত মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই আট শতাধিক আরএনবি সদস্যকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বদলি করেছেন, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি।

অর্থের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয় কর্মস্থলের গুরুত্ব। বাহিনীর সাধারণ সদস্যদের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ধরে রাখা কিংবা আকস্মিক বদলির আদেশ ঠেকাতে সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পদের স্কেল ও দায়িত্বের সংবেদনশীলতা অনুযায়ী এই দরদাম নির্ধারিত হয়। সাধারণ সিপাহীদের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা, পোস্টিং হাবিলদারদের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং তুলনামূলক লাভজনক স্থানে পোস্টিংয়ের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ের জন্য এই রেট ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং চিফ ইন্সপেক্টরদের সুবিধাজনক স্থানে পদায়নের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ লেনদেন হয়। এই বিশাল বদলি-বাণিজ্যের চূড়ান্ত ফাইল প্রক্রিয়াকরণ ও প্রশাসনিক বাস্তবায়নে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেন উজ্জ্বল অনুঘটক ও মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেন বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।

শুধুই পূর্বাঞ্চল নয়, ইতিপূর্বে পশ্চিমাঞ্চলে দায়িত্ব পালনের সময়ও জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মারাত্মক অর্থনৈতিক অনিয়মের নজির রয়েছে। সেখানে সৃষ্টি হওয়া একটি বিশাল আর্থিক দুর্নীতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম হট্টগোল সৃষ্টি হলে ভুক্তভোগী সদস্যদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন সাদ্দাম হোসেন নামের এক সদস্য। সেই সময় ক্ষুব্ধ সদস্যদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল। এই অর্থ লেনদেন ও অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সাদ্দাম হোসেন এবং সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেন উজ্জ্বলের মধ্যকার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অডিও কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই অডিও ক্লিপটির আধুনিক ফরেনসিক বিশ্লেষণ, সময়ের সঠিক মেলবন্ধন এবং অর্থের মূল উৎস সন্ধান করা হলে জহিরুল ইসলাম ও তাঁর সিন্ডিকেটের ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মূল চেহারা দেশবাসীর সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

সরকারি দায়িত্বে থাকাকালীন যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও, জহিরুল ইসলাম তাঁর প্রশাসনিক আধিপত্য ও অপকর্ম ঢাকা দেওয়ার কাজে স্বজনদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সুনির্দিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, জহিরুল ইসলামের আপন ভাই আমিনুল ইসলাম সুজন ছিলেন ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সাংগঠনিক সম্পাদক এবং উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজের পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে ভাইয়ের সেই দলীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জহিরুল ইসলাম বাহিনীর ভেতরে একচ্ছত্র ছড়ি ঘুরিয়েছেন এবং যেকোনো আইনি বা প্রশাসনিক তদন্ত প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছেন।

জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অসংখ্য অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ফোরক ও মারাত্মক অপরাধটি সংঘটিত হয়েছিল ২০১৭ সালের ১৮৫ জন আরএনবি সিপাহী নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অনৈতিক অর্থ গ্রহণ করে তাঁদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করানো এবং বিপরীতে প্রকৃত মেধানুক্রম ও যোগ্য প্রার্থীদের পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে ছাড়পত্র মেলার পর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আলোকে ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত পরীক্ষা ও ভাইভা গ্রহণ করা হয়। এতে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয় এবং রেলওয়ের নিজস্ব তদন্তেও এর ভয়াবহ সত্যতা পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ হস্তগত হলে ২০২২ সালের ২১ জুন দুদক প্রধান কার্যালয় মামলার অনুমোদন দেয় এবং ২৮ আগস্ট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় লিখিত পরীক্ষায় ২৫ নম্বরের বেশি পাওয়া চরম যোগ্য ১৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫ জনকে সম্পূর্ণ অসাধু উপায়ে ফেল দেখানো হয়েছিল, যাঁদের সমন্বিত প্রাপ্ত নম্বর ছিল ২০ দশমিক ২ থেকে ২৪ দশমিক ৪ পর্যন্ত। অন্যদিকে একই কোটায় লিখিত পরীক্ষায় সরাসরি ফেল করা ৯ জন অযোগ্য প্রার্থীর খাতার নম্বর কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁদের চাকরি সুনিশ্চিত করা হয়। একইভাবে জেলা ও পোষ্য কোটাতেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা উপেক্ষা করে মেধাতালিকা রাতারাতি বাতিল করা হয়েছিল এবং মানিকগঞ্জের প্রার্থীর স্থলে টাঙ্গাইল এবং নারায়ণগঞ্জের প্রার্থীর জায়গায় মানিকগঞ্জের প্রার্থীকে বসিয়ে চরম কোটা কারচুপি করা হয়। এত বড় নিয়োগ কেলেঙ্কারির প্রধান আসামি হওয়া সত্ত্বেও ২০২২ সালে পূর্বাঞ্চলের অত্যন্ত সংবেদনশীল ৮০৬ জন সিপাহী নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে জহিরুল ইসলামকে পুনরায় কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তা নিয়েও রেলওয়ে প্রশাসনের সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম বিস্ময় ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

বর্তমানে মামলাটির হালনাগাদ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১-এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম স্পষ্টভাবে জানান যে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ১৮৫ জন সিপাহী নিয়োগ জালিয়াতি ও দুর্নীতির মামলাটি সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবগত। মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রাম আদালতে চলমান রয়েছে এবং এর অধিকতর গভীর অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি এখন প্রক্রিয়াধীন।

প্রশাসনিক দুর্নীতির পাশাপাশি জহিরুল ইসলামের সম্পদের পাহাড়াও চোখে পড়ার মতো। ২০২৩ সালে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, জহিরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী কাজী জিন্নাতুন নাহার-এর নামে সোয়া চার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর অনার্জিত সম্পদের তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। অনুসন্ধানের প্রাথমিক তথ্যমতে, রাজধানীর অভিজাত মিরপুরের সেনপাড়া মৌজায় জহিরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী যৌথভাবে একটি বিশাল সম্পত্তি ক্রয় করেন, যার আনুষ্ঠানিক দলিলমূল্যই ধরা হয়েছিল ৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে জহিরুল ইসলামের একক নামীয় অংশের বাজারমূল্যই প্রায় দুই কোটি টাকা। এর বাইরেও ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শহীদবাগ এবং উত্তরায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর ও তাঁর বেনামে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদের প্রাথমিক তালিকা দুদকের নিকট রক্ষিত রয়েছে।

এসব গুরুতর ও একের পর এক চোখ কপালে ওঠার মতো স্পর্শকাতর অভিযোগের বিষয়ে চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে তাঁর বক্তব্য জানতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলে তিনি জানান, 'উদ্দেশ্য প্রণোদিত রিপোর্ট, সঠিক না।'

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে জারি করা পদায়ন নির্দেশিকা অমান্য করার বিষয়ে এবং প্রশাসনিক শিথিলতার কারণ জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক এবং রেলওয়ের মহাপরিচালকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁদের সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে এই প্রশাসনিক মাফিয়াতন্ত্র ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি সাংবাদিক পরিচয় শোনার সাথে সাথেই অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

একজন অভিযুক্ত ও দুদকের মামলার আসামি কর্মকর্তা কীভাবে বছরের পর বছর রেলওয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন, আর কেনই বা প্রশাসনের নীতি নির্ধারকেরা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন, সেই প্রশ্নই এখন পুরো রেল পূর্বাঞ্চলে বাতাসে ভাসছে।

 

 

(দ্বিতীয় পর্ব: ক্যাসিনো থেকে পরকীয়া, আরএনবি চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুলের অন্ধকারের রাজত্ব)

সরকারি পোশাকের আড়ালে এক ভিন্ন জহিরুল! রাতে ক্লাবে বসে লাখ টাকার জুয়া খেলা, ভিডিও ফুটেজে জহিরুলের জুয়ার দান, আর অধস্তনের পরিবারকে ফ্ল্যাট উপহার দিয়ে গড়ে তোলা অনৈতিক সাম্রাজ্য, কী রয়েছে সেই গোপন অডিও রেকর্ডে?

​চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের নৈতিক স্খলন ও ব্যক্তিগত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের যাবতীয় দালিলিক প্রমাণ নিয়ে বিস্তারিত আসছে আগামী সংখ্যায়।

আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


নিরাপত্তার জহিরুলের হাতেই অনিরাপদ রেল

প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

অনিয়ম, অনৈতিক অর্থ লেনদেন, প্রশাসনিক কাঠামোর যথেচ্ছ অপব্যবহার, নির্দিষ্ট ক্যাডারে বিপুল অংকের মাসোহারা আদায়, নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি থেকে শুরু করে ক্ষমতার অসীম দাপটে অঢেল ও দৃশ্যমান সম্পদ অর্জনের এক নজিরবিহীন মহোৎসব চলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি)। 

আর এই বিশৃঙ্খলা, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং পুরো অপকর্ম সিন্ডিকেটের নেপথ্য মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সরাসরি আঙুল উঠেছে বাহিনীটির চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের দিকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের গুরুতর মামলা, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তীব্র অসন্তোষ, অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং একের পর এক দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর দালিলিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসার পরও এক অলৌকিক ও রহস্যজনক শক্তিবলে তিনি নিজের আসনেই বহাল তবিয়তে অবস্থান করছেন। প্রশাসনিক শাস্তির তোয়াক্কা না করে এই বিতর্কিত কর্মকর্তা যেভাবে তাঁর ক্ষমতার রাজত্ব বজায় রেখেছেন, তাতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা, নিরবতা ও নীরব প্রশ্রয় নিয়ে পুরো রেল অঙ্গনে এখন তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

রেল পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব যাঁর ওপর ন্যস্ত, সেই জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে তা সাধারণ প্রশাসনিক অনিয়মের সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদে ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সংশোধিত নির্দেশিকা এবং দপ্তরাদেশ জারি করা হয়েছিল। সেই দপ্তরাদেশ অনুযায়ী, গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত কর্মচারীদের আন্তঃজোনাল অর্থাৎ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বদলির ক্ষেত্রে সরাসরি মহাপরিচালকের অনুশাসন ও অনুমোদন বাধ্যতামূলক ছিল এবং এই সংক্রান্ত অফিস আদেশও ডিজি কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে নির্গত হওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। অন্যদিকে, একই বিভাগের অভ্যন্তরীণ পদায়ন বা বদলির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বা জোনের মহাব্যবস্থাপকের লিখিত প্রশাসনিক সম্মতি প্রয়োজন হতো। কিন্তু বাস্তবে এই সমস্ত নির্দেশিকা কেবল লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, জহিরুল ইসলাম প্রশাসনিক এই সমস্ত আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে নিজের একক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। কোথাও কোথাও জোনাল মহাব্যবস্থাপক কিংবা মহাপরিচালকের নাম অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে ব্যাকডেটেড বা বেনামী আদেশের মাধ্যমে নিজস্ব অনুগত সদস্যদের সুবিধাজনক স্থানে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। বাহিনীর সদস্যদের জোরালো দাবি, গত কয়েক বছরের নোটশিট, বদলি সংক্রান্ত ফাইল ও অনুমোদনের নথি নিরপেক্ষ কোনো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন দিয়ে পর্যালোচনা করলেই এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মূল চিত্র উন্মোচিত হতে পারে।

এই বদলি ও পদায়নকে ঘিরে আরএনবির অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে এক অনৈতিক অর্থনীতির অদৃশ্য বলয়। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সদস্যদের সুনির্দিষ্ট তথ্যমতে, চিফ কমান্ড্যান্টের কাছে প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী বা উপরমহলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পৌঁছাতে পারলেই হাবিলদার, চিফ ইন্সপেক্টর কিংবা সাধারণ সিপাহীরা তাঁদের পছন্দের ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক স্থানে বদলি হতে পারেন। শুধুই বদলির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ পকেটস্থ করা নয়, বরং অর্থ গ্রহণের পর অন্য কারও কাছ থেকে আরও মোটা অঙ্কের অফার পেলে পূর্বের সদস্যকে প্রতারিত করে বেশি দরদাতাকে সেই পদে বসিয়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগও উঠেছে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাহিনীর এক ক্ষুব্ধ ইন্সপেক্টর অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান, কাঙ্ক্ষিত স্থানে বদলির স্পষ্ট আশ্বাস দিয়ে চিফ কমান্ড্যান্ট নিজে তাঁর কাছ থেকে নগদ দুই লাখ টাকা গ্রহণ করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে উপরমহলের রাজনৈতিক প্রভাব এবং অন্য এক প্রার্থীর কাছ থেকে আরও অধিক পরিমাণ অনৈতিক অর্থ পাওয়ার লোভে সেই পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাতিল করে অন্য সদস্যকে সেখানে পদায়ন করা হয়। এমনকি অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা সেই ইন্সপেক্টরকে নির্ধারিত স্থানে বদলি তো করা হয়ইনি, বরং তাঁর কষ্টার্জিত দুই লাখ টাকাও আর ফেরত দেওয়া হয়নি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল নিরাপত্তা বাহিনীর চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের অস্ত্র শাখা, জেনারেল শাখা, গোয়েন্দা শাখা, চট্টগ্রাম গুড পোর্ট ইয়ার্ড সহ বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল সার্কেলের আওতাধীন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা, ডিউটি বণ্টনে চরম স্বজনপ্রীতি, ভুয়া টি/এ ও ডি/এ বিল-ভাউচার প্রস্তুতকরণ, কোনো ডিউটি না করেই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার অনৈতিক প্রথা তথা কথিত ‘ভগবান ডিউটি’ এবং টিকিট কালোবাজারিসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চাঙ্গা রয়েছে। এই সমস্ত অবৈধ ও অনৈতিক খাত থেকে প্রতিটি সার্কেলে প্রতি মাসে আদায় হয় বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ, যা পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট অবৈধ ফান্ডে জমা হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এই অবৈধ অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী কমান্ড্যান্ট, কমান্ড্যান্ট, কমান্ড্যান্ট সদর এবং চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামের কাছে বাধ্যবাধকতার সাথে পৌঁছে দিতে হয়। কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা ও প্রভাব অনুযায়ী এই অবৈধ চাঁদার হার শতকরা ৫ ভাগ থেকে শুরু করে ২০ ভাগ পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, কোনো সার্কেলে সদ্য পোস্টিং পাওয়া কোনো হাবিলদার কিংবা ইন্সপেক্টর যদি এই অনৈতিক চাঁদা আদায়ে অস্বীকৃতি জানান বা সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাঁদাবাজি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তবে তাঁকে অনতিবিলম্বে শাস্তিমূলক বদলি করে দুর্গম বা গুরুত্বহীন স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে যিনি নিয়মিত এই অবৈধ মাসোহারা বা চাঁদার টাকা সদর দপ্তরে পৌঁছাতে পারেন এবং অর্থের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে পারেন, তাঁকেই পুরস্কৃত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত দায়িত্বে পদায়ন করা হয়। অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একের পর এক এমন ঘটনায় বাধ্য হয়ে সৎ ও নীতিবান কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াচ্ছেন। জানা গেছে, জহিরুল ইসলাম পূর্বাঞ্চলে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিগত মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই আট শতাধিক আরএনবি সদস্যকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বদলি করেছেন, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি।

অর্থের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয় কর্মস্থলের গুরুত্ব। বাহিনীর সাধারণ সদস্যদের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ধরে রাখা কিংবা আকস্মিক বদলির আদেশ ঠেকাতে সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পদের স্কেল ও দায়িত্বের সংবেদনশীলতা অনুযায়ী এই দরদাম নির্ধারিত হয়। সাধারণ সিপাহীদের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা, পোস্টিং হাবিলদারদের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং তুলনামূলক লাভজনক স্থানে পোস্টিংয়ের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ের জন্য এই রেট ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং চিফ ইন্সপেক্টরদের সুবিধাজনক স্থানে পদায়নের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ লেনদেন হয়। এই বিশাল বদলি-বাণিজ্যের চূড়ান্ত ফাইল প্রক্রিয়াকরণ ও প্রশাসনিক বাস্তবায়নে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেন উজ্জ্বল অনুঘটক ও মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেন বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।

শুধুই পূর্বাঞ্চল নয়, ইতিপূর্বে পশ্চিমাঞ্চলে দায়িত্ব পালনের সময়ও জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মারাত্মক অর্থনৈতিক অনিয়মের নজির রয়েছে। সেখানে সৃষ্টি হওয়া একটি বিশাল আর্থিক দুর্নীতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম হট্টগোল সৃষ্টি হলে ভুক্তভোগী সদস্যদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন সাদ্দাম হোসেন নামের এক সদস্য। সেই সময় ক্ষুব্ধ সদস্যদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল। এই অর্থ লেনদেন ও অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সাদ্দাম হোসেন এবং সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেন উজ্জ্বলের মধ্যকার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অডিও কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই অডিও ক্লিপটির আধুনিক ফরেনসিক বিশ্লেষণ, সময়ের সঠিক মেলবন্ধন এবং অর্থের মূল উৎস সন্ধান করা হলে জহিরুল ইসলাম ও তাঁর সিন্ডিকেটের ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মূল চেহারা দেশবাসীর সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

সরকারি দায়িত্বে থাকাকালীন যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও, জহিরুল ইসলাম তাঁর প্রশাসনিক আধিপত্য ও অপকর্ম ঢাকা দেওয়ার কাজে স্বজনদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সুনির্দিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, জহিরুল ইসলামের আপন ভাই আমিনুল ইসলাম সুজন ছিলেন ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সাংগঠনিক সম্পাদক এবং উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজের পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে ভাইয়ের সেই দলীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জহিরুল ইসলাম বাহিনীর ভেতরে একচ্ছত্র ছড়ি ঘুরিয়েছেন এবং যেকোনো আইনি বা প্রশাসনিক তদন্ত প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছেন।

জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অসংখ্য অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ফোরক ও মারাত্মক অপরাধটি সংঘটিত হয়েছিল ২০১৭ সালের ১৮৫ জন আরএনবি সিপাহী নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অনৈতিক অর্থ গ্রহণ করে তাঁদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করানো এবং বিপরীতে প্রকৃত মেধানুক্রম ও যোগ্য প্রার্থীদের পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে ছাড়পত্র মেলার পর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আলোকে ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত পরীক্ষা ও ভাইভা গ্রহণ করা হয়। এতে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয় এবং রেলওয়ের নিজস্ব তদন্তেও এর ভয়াবহ সত্যতা পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ হস্তগত হলে ২০২২ সালের ২১ জুন দুদক প্রধান কার্যালয় মামলার অনুমোদন দেয় এবং ২৮ আগস্ট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় লিখিত পরীক্ষায় ২৫ নম্বরের বেশি পাওয়া চরম যোগ্য ১৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫ জনকে সম্পূর্ণ অসাধু উপায়ে ফেল দেখানো হয়েছিল, যাঁদের সমন্বিত প্রাপ্ত নম্বর ছিল ২০ দশমিক ২ থেকে ২৪ দশমিক ৪ পর্যন্ত। অন্যদিকে একই কোটায় লিখিত পরীক্ষায় সরাসরি ফেল করা ৯ জন অযোগ্য প্রার্থীর খাতার নম্বর কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁদের চাকরি সুনিশ্চিত করা হয়। একইভাবে জেলা ও পোষ্য কোটাতেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা উপেক্ষা করে মেধাতালিকা রাতারাতি বাতিল করা হয়েছিল এবং মানিকগঞ্জের প্রার্থীর স্থলে টাঙ্গাইল এবং নারায়ণগঞ্জের প্রার্থীর জায়গায় মানিকগঞ্জের প্রার্থীকে বসিয়ে চরম কোটা কারচুপি করা হয়। এত বড় নিয়োগ কেলেঙ্কারির প্রধান আসামি হওয়া সত্ত্বেও ২০২২ সালে পূর্বাঞ্চলের অত্যন্ত সংবেদনশীল ৮০৬ জন সিপাহী নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে জহিরুল ইসলামকে পুনরায় কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তা নিয়েও রেলওয়ে প্রশাসনের সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম বিস্ময় ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

বর্তমানে মামলাটির হালনাগাদ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১-এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম স্পষ্টভাবে জানান যে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ১৮৫ জন সিপাহী নিয়োগ জালিয়াতি ও দুর্নীতির মামলাটি সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবগত। মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রাম আদালতে চলমান রয়েছে এবং এর অধিকতর গভীর অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি এখন প্রক্রিয়াধীন।

প্রশাসনিক দুর্নীতির পাশাপাশি জহিরুল ইসলামের সম্পদের পাহাড়াও চোখে পড়ার মতো। ২০২৩ সালে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, জহিরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী কাজী জিন্নাতুন নাহার-এর নামে সোয়া চার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর অনার্জিত সম্পদের তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। অনুসন্ধানের প্রাথমিক তথ্যমতে, রাজধানীর অভিজাত মিরপুরের সেনপাড়া মৌজায় জহিরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী যৌথভাবে একটি বিশাল সম্পত্তি ক্রয় করেন, যার আনুষ্ঠানিক দলিলমূল্যই ধরা হয়েছিল ৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে জহিরুল ইসলামের একক নামীয় অংশের বাজারমূল্যই প্রায় দুই কোটি টাকা। এর বাইরেও ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শহীদবাগ এবং উত্তরায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর ও তাঁর বেনামে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদের প্রাথমিক তালিকা দুদকের নিকট রক্ষিত রয়েছে।

এসব গুরুতর ও একের পর এক চোখ কপালে ওঠার মতো স্পর্শকাতর অভিযোগের বিষয়ে চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে তাঁর বক্তব্য জানতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলে তিনি জানান, 'উদ্দেশ্য প্রণোদিত রিপোর্ট, সঠিক না।'

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে জারি করা পদায়ন নির্দেশিকা অমান্য করার বিষয়ে এবং প্রশাসনিক শিথিলতার কারণ জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক এবং রেলওয়ের মহাপরিচালকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁদের সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে এই প্রশাসনিক মাফিয়াতন্ত্র ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি সাংবাদিক পরিচয় শোনার সাথে সাথেই অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

একজন অভিযুক্ত ও দুদকের মামলার আসামি কর্মকর্তা কীভাবে বছরের পর বছর রেলওয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন, আর কেনই বা প্রশাসনের নীতি নির্ধারকেরা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন, সেই প্রশ্নই এখন পুরো রেল পূর্বাঞ্চলে বাতাসে ভাসছে।

 

 

(দ্বিতীয় পর্ব: ক্যাসিনো থেকে পরকীয়া, আরএনবি চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুলের অন্ধকারের রাজত্ব)

সরকারি পোশাকের আড়ালে এক ভিন্ন জহিরুল! রাতে ক্লাবে বসে লাখ টাকার জুয়া খেলা, ভিডিও ফুটেজে জহিরুলের জুয়ার দান, আর অধস্তনের পরিবারকে ফ্ল্যাট উপহার দিয়ে গড়ে তোলা অনৈতিক সাম্রাজ্য, কী রয়েছে সেই গোপন অডিও রেকর্ডে?

​চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের নৈতিক স্খলন ও ব্যক্তিগত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের যাবতীয় দালিলিক প্রমাণ নিয়ে বিস্তারিত আসছে আগামী সংখ্যায়।


জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত