জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে টেলিটক; বকেয়া ৫,৯৫৪ কোটি



বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে টেলিটক; বকেয়া ৫,৯৫৪ কোটি

রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অসংগতি ও বিপুল অঙ্কের হিসাবের গরমিলের চিত্র উঠে এসেছে সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) সঙ্গে টেলিটকের পাওনা ও দেনার হিসাবে শত শত কোটি টাকার পার্থক্য, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ৮০ কোটি টাকার ইউনিফাইড লাইসেন্স ফি আর্থিক বিবরণীতে প্রভিশন না রাখা, বৈদেশিক ঋণের হিসাবে ৬৫০ কোটি টাকার বেশি পার্থক্য এবং চলতি দায়-সম্পদের বড় ঘাটতি—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান আহসান মঞ্জুর অ্যান্ড কোং টেলিটকের হিসাবের ওপর ‘কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন’ দিয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ হিসাব ও তথ্যের বিষয়ে অডিটররা আপত্তি তুলেছেন এবং এসব বিষয়ে আর্থিক বিবরণী সংশোধন বা যথাযথ ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।

সবচেয়ে বড় গরমিল পাওয়া গেছে সরকারি আরেক প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলের সঙ্গে টেলিটকের হিসাব মিলাতে গিয়ে। টেলিটকের হিসাবে বিটিসিএলের কাছে তাদের পাওনা ৭০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। কিন্তু বিটিসিএলের কাছ থেকে পাওয়া বাহ্যিক নিশ্চায়ন অনুযায়ী, সেই পাওনা মাত্র ৫০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। দুই হিসাবের পার্থক্য ২০ কোটি ২২ লাখ টাকা।

আর দেনার হিসাবে পার্থক্য আরও ভয়াবহ। টেলিটকের আর্থিক বিবরণীতে বিটিসিএলের কাছে তাদের দেনা দেখানো হয়েছে ১০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। বিপরীতে বিটিসিএলের হিসাব অনুযায়ী, টেলিটকের কাছে তাদের পাওনা ৫৭৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ফলে শুধু এই হিসাবেই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অমীমাংসিত পার্থক্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

অডিটররা প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, এই বিপুল পার্থক্যের বিষয়ে টেলিটক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে উপযুক্ত ব্যাখ্যা ও হিসাব সমন্বয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিটিআরসির পাওনার হিসাবেও প্রশ্ন উঠেছে। অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২জি, ৩জি, ৪জি ও ৫জি ইউনিফাইড লাইসেন্স ফি বাবদ টেলিটকের মোট ৮০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এই অর্থের জন্য আর্থিক বিবরণীতে কোনো প্রভিশন রাখেনি।

টেলিটকের ব্যাখ্যা, বিশ্বের অনেক সরকারি মোবাইল অপারেটর নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে লাইসেন্স ফি দেয় না। এ যুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের কাছে ইউনিফাইড লাইসেন্স ফি বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ফি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত দায়টি কীভাবে আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলিত হবে—সেই প্রশ্নেই অডিট আপত্তি তুলেছে।

শুধু লাইসেন্স ফিই নয়, বিটিআরসির কাছে রাজস্ব ভাগাভাগি, স্পেকট্রাম ফি, প্রশাসনিক জরিমানা ও সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ডসহ বিভিন্ন খাতে টেলিটকের বিপুল বকেয়া রয়েছে।

সংসদে ২৪ জুন ২০২৬ ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, টেলিটকের কাছে সরকারের মোট পাওনা ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে লাইসেন্স ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি, স্পেকট্রাম ফি, প্রশাসনিক জরিমানা ও সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ফান্ডের অর্থ রয়েছে। বকেয়ার মধ্যে ৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা ইকুইটিতে রূপান্তরের জন্য টেলিটকের আবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে।

অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকা অবস্থায় টেলিটকের আর্থিক বিবরণীতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেলিটকের হিসাব ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

অন্যদিকে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া ৩জি প্রকল্পের ঋণের হিসাবেও বড় ধরনের অসংগতি পেয়েছেন অডিটররা। ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত ওই ঋণের হিসাব টেলিটক দেখিয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক হিসাবমান IAS-21 অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বিবেচনায় ঋণের পরিমাণ হওয়ার কথা প্রায় ২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। ফলে প্রায় ৬৫০ কোটি ২৯ লাখ টাকার পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

৩জি প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের ঋণের হিসাবেও প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার পার্থক্য শনাক্ত হয়েছে। অডিটরদের আপত্তির অন্যতম ভিত্তি হয়েছে এসব ঋণমূল্যের অসংগতি।

টেলিটকের আর্থিক সংকটের চিত্রও স্পষ্ট হয়েছে অডিটে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা। এর ফলে পুঞ্জীভূত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৭৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

একই সময়ে টেলিটকের চলতি দায় চলতি সম্পদের চেয়ে ৭০৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বেশি ছিল। অডিটররা এটিকে ‘ম্যাটেরিয়াল আনসার্টেনটি রিলেটেড টু গোয়িং কনসার্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে কি না, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অডিটে আরও দেখা গেছে, টেলিটক দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকলেও প্রায় ৯০৩ কোটি টাকা ডিফার্ড ট্যাক্স অ্যাসেট হিসেবে দেখিয়েছে। অডিটরদের মতে, ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত করযোগ্য মুনাফা না হলে এই সুবিধা আদায় করা কঠিন হতে পারে।

এ ছাড়া নেটওয়ার্ক বেস স্টেশন, করপোরেট অফিস ও প্রকল্প কার্যালয়সহ বিভিন্ন লিজের হিসাব IFRS-16 অনুযায়ী আর্থিক বিবরণীতে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলেও অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—একদিকে রাষ্ট্রীয় এই মোবাইল অপারেটরের কাছে সরকারের পাওনা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব হিসাবেই শত শত কোটি টাকার গরমিল ধরা পড়ছে। বিটিসিএলের সঙ্গে ৪৭৬ কোটি টাকার হিসাব মেলেনি, ৮০ কোটি টাকার লাইসেন্স ফি নিয়ে আপত্তি রয়েছে এবং বৈদেশিক ঋণের হিসাবেও ৬৫০ কোটি টাকার বেশি পার্থক্য শনাক্ত হয়েছে।

টেলিটক- ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে জানান, বিটিসিএল-টেলিটক  উভয় পক্ষ একে অপরের নিকট অর্থ পাওনা রয়েছে । বকেয়া পাওনাদির বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন হয়েছে । কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাওনাদির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হবে ।

তিনি আরো জানান, সরকারের লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য বকেয়া পাওনা ইকুইটিতে রুপান্তরের জন্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রস্তাব প্রেরন করা হয়েছে । আশা করা যাচ্ছে অচিরেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হবে । টেলিটক-এর নিট লোকসান চলতি অর্থ বছরে কমিয়ে আনা হয়েছে এবং অচিরেই তথ্য ওয়েব সাইটে আপলোড করা হবে। অন্যান্য প্রশ্নের ক্ষেত্রে  যাচায়-বাছায় শেষে প্রশ্নের জবাব প্রদান করা হবে জানান তিনি।


আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে টেলিটক; বকেয়া ৫,৯৫৪ কোটি

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অসংগতি ও বিপুল অঙ্কের হিসাবের গরমিলের চিত্র উঠে এসেছে সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) সঙ্গে টেলিটকের পাওনা ও দেনার হিসাবে শত শত কোটি টাকার পার্থক্য, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ৮০ কোটি টাকার ইউনিফাইড লাইসেন্স ফি আর্থিক বিবরণীতে প্রভিশন না রাখা, বৈদেশিক ঋণের হিসাবে ৬৫০ কোটি টাকার বেশি পার্থক্য এবং চলতি দায়-সম্পদের বড় ঘাটতি—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান আহসান মঞ্জুর অ্যান্ড কোং টেলিটকের হিসাবের ওপর ‘কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন’ দিয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ হিসাব ও তথ্যের বিষয়ে অডিটররা আপত্তি তুলেছেন এবং এসব বিষয়ে আর্থিক বিবরণী সংশোধন বা যথাযথ ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।

সবচেয়ে বড় গরমিল পাওয়া গেছে সরকারি আরেক প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলের সঙ্গে টেলিটকের হিসাব মিলাতে গিয়ে। টেলিটকের হিসাবে বিটিসিএলের কাছে তাদের পাওনা ৭০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। কিন্তু বিটিসিএলের কাছ থেকে পাওয়া বাহ্যিক নিশ্চায়ন অনুযায়ী, সেই পাওনা মাত্র ৫০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। দুই হিসাবের পার্থক্য ২০ কোটি ২২ লাখ টাকা।

আর দেনার হিসাবে পার্থক্য আরও ভয়াবহ। টেলিটকের আর্থিক বিবরণীতে বিটিসিএলের কাছে তাদের দেনা দেখানো হয়েছে ১০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। বিপরীতে বিটিসিএলের হিসাব অনুযায়ী, টেলিটকের কাছে তাদের পাওনা ৫৭৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ফলে শুধু এই হিসাবেই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অমীমাংসিত পার্থক্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

অডিটররা প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, এই বিপুল পার্থক্যের বিষয়ে টেলিটক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে উপযুক্ত ব্যাখ্যা ও হিসাব সমন্বয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিটিআরসির পাওনার হিসাবেও প্রশ্ন উঠেছে। অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২জি, ৩জি, ৪জি ও ৫জি ইউনিফাইড লাইসেন্স ফি বাবদ টেলিটকের মোট ৮০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এই অর্থের জন্য আর্থিক বিবরণীতে কোনো প্রভিশন রাখেনি।

টেলিটকের ব্যাখ্যা, বিশ্বের অনেক সরকারি মোবাইল অপারেটর নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে লাইসেন্স ফি দেয় না। এ যুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের কাছে ইউনিফাইড লাইসেন্স ফি বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ফি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত দায়টি কীভাবে আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলিত হবে—সেই প্রশ্নেই অডিট আপত্তি তুলেছে।

শুধু লাইসেন্স ফিই নয়, বিটিআরসির কাছে রাজস্ব ভাগাভাগি, স্পেকট্রাম ফি, প্রশাসনিক জরিমানা ও সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ডসহ বিভিন্ন খাতে টেলিটকের বিপুল বকেয়া রয়েছে।

সংসদে ২৪ জুন ২০২৬ ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, টেলিটকের কাছে সরকারের মোট পাওনা ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে লাইসেন্স ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি, স্পেকট্রাম ফি, প্রশাসনিক জরিমানা ও সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ফান্ডের অর্থ রয়েছে। বকেয়ার মধ্যে ৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা ইকুইটিতে রূপান্তরের জন্য টেলিটকের আবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে।

অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকা অবস্থায় টেলিটকের আর্থিক বিবরণীতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেলিটকের হিসাব ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

অন্যদিকে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া ৩জি প্রকল্পের ঋণের হিসাবেও বড় ধরনের অসংগতি পেয়েছেন অডিটররা। ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত ওই ঋণের হিসাব টেলিটক দেখিয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক হিসাবমান IAS-21 অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বিবেচনায় ঋণের পরিমাণ হওয়ার কথা প্রায় ২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। ফলে প্রায় ৬৫০ কোটি ২৯ লাখ টাকার পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

৩জি প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের ঋণের হিসাবেও প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার পার্থক্য শনাক্ত হয়েছে। অডিটরদের আপত্তির অন্যতম ভিত্তি হয়েছে এসব ঋণমূল্যের অসংগতি।

টেলিটকের আর্থিক সংকটের চিত্রও স্পষ্ট হয়েছে অডিটে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা। এর ফলে পুঞ্জীভূত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৭৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

একই সময়ে টেলিটকের চলতি দায় চলতি সম্পদের চেয়ে ৭০৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বেশি ছিল। অডিটররা এটিকে ‘ম্যাটেরিয়াল আনসার্টেনটি রিলেটেড টু গোয়িং কনসার্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে কি না, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অডিটে আরও দেখা গেছে, টেলিটক দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকলেও প্রায় ৯০৩ কোটি টাকা ডিফার্ড ট্যাক্স অ্যাসেট হিসেবে দেখিয়েছে। অডিটরদের মতে, ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত করযোগ্য মুনাফা না হলে এই সুবিধা আদায় করা কঠিন হতে পারে।

এ ছাড়া নেটওয়ার্ক বেস স্টেশন, করপোরেট অফিস ও প্রকল্প কার্যালয়সহ বিভিন্ন লিজের হিসাব IFRS-16 অনুযায়ী আর্থিক বিবরণীতে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলেও অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—একদিকে রাষ্ট্রীয় এই মোবাইল অপারেটরের কাছে সরকারের পাওনা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব হিসাবেই শত শত কোটি টাকার গরমিল ধরা পড়ছে। বিটিসিএলের সঙ্গে ৪৭৬ কোটি টাকার হিসাব মেলেনি, ৮০ কোটি টাকার লাইসেন্স ফি নিয়ে আপত্তি রয়েছে এবং বৈদেশিক ঋণের হিসাবেও ৬৫০ কোটি টাকার বেশি পার্থক্য শনাক্ত হয়েছে।

টেলিটক- ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে জানান, বিটিসিএল-টেলিটক  উভয় পক্ষ একে অপরের নিকট অর্থ পাওনা রয়েছে । বকেয়া পাওনাদির বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন হয়েছে । কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাওনাদির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হবে ।

তিনি আরো জানান, সরকারের লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য বকেয়া পাওনা ইকুইটিতে রুপান্তরের জন্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রস্তাব প্রেরন করা হয়েছে । আশা করা যাচ্ছে অচিরেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হবে । টেলিটক-এর নিট লোকসান চলতি অর্থ বছরে কমিয়ে আনা হয়েছে এবং অচিরেই তথ্য ওয়েব সাইটে আপলোড করা হবে। অন্যান্য প্রশ্নের ক্ষেত্রে  যাচায়-বাছায় শেষে প্রশ্নের জবাব প্রদান করা হবে জানান তিনি।



জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত