চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭৬, সেখানে আগস্টেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন শুধু আগস্ট মাসে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ ডেঙ্গু প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খালেদা বেগম (৪৭) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। মৃতদের মধ্যে তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৮৬ জন। এর মধ্যে নগরের ৯৩৬ জন, জেলার বিভিন্ন এলাকার ৯৫৫ জন এবং চট্টগ্রামের বাইরে থেকে এসে চিকিৎসা নেওয়া ২৯৫ জন রয়েছেন।
আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ১৫১ জন, নারী ৬০২ জন এবং শিশু ৪৩৩ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮৭ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৪৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৩৯ জন।
আগস্টে এক মাসেই আক্রান্ত ১২০২ : চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আগস্টে। ওই এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। এর আগে জুনে আক্রান্ত হন ১২২ জন। জুলাইয়ে সংক্রমণ আরও বেড়ে যায়। বছরের শুরুতে পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে ছিল। জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৭৬ জন। এরপর জুন থেকে সংক্রমণের গতি বাড়তে থাকে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়েই আক্রান্তের সংখ্যা ৪৭২ জনে পৌঁছালে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক করে। তবে এরপর আগস্টে পরিস্থিতি আরও দ্রুত অবনতি ঘটে।
১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছিল, আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তখন চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১০৮। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৮ জন আক্রান্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৮৬ জনে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব কমেনি। নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালানোর দাবি থাকলেও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর অভিযান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত স্থাপনা, ছাদ, বারান্দা, খোলা জায়গা এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করছে। ফলে শুধু মশক নিধন কার্যক্রম নয়, এসব প্রজননস্থল চিহ্নিত করে পানি অপসারণ ও নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে নগরবাসীকেও নিজেদের বাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
মশারির ভেতরে রাখার পরামর্শ : চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতন হওয়া সবচেয়ে জরুরি। নিজেদের ঘরবাড়ি ও আঙিনায় কোথাও যেন পানি জমে মশার বংশবৃদ্ধি না ঘটে, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা গেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের মশারির ভেতরে রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আক্রান্ত রোগীকে মশারির বাইরে রাখা হলে তার শরীর থেকে মশার মাধ্যমে আশপাশের অন্য মানুষও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চট্টগ্রামে আগস্টে এক মাসে ১ হাজার ২০২ জন আক্রান্ত হওয়ার পর সেপ্টেম্বরেও প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত ও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭৬, সেখানে আগস্টেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন শুধু আগস্ট মাসে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ ডেঙ্গু প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খালেদা বেগম (৪৭) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। মৃতদের মধ্যে তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৮৬ জন। এর মধ্যে নগরের ৯৩৬ জন, জেলার বিভিন্ন এলাকার ৯৫৫ জন এবং চট্টগ্রামের বাইরে থেকে এসে চিকিৎসা নেওয়া ২৯৫ জন রয়েছেন।
আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ১৫১ জন, নারী ৬০২ জন এবং শিশু ৪৩৩ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮৭ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৪৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৩৯ জন।
আগস্টে এক মাসেই আক্রান্ত ১২০২ : চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আগস্টে। ওই এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। এর আগে জুনে আক্রান্ত হন ১২২ জন। জুলাইয়ে সংক্রমণ আরও বেড়ে যায়। বছরের শুরুতে পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে ছিল। জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৭৬ জন। এরপর জুন থেকে সংক্রমণের গতি বাড়তে থাকে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়েই আক্রান্তের সংখ্যা ৪৭২ জনে পৌঁছালে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক করে। তবে এরপর আগস্টে পরিস্থিতি আরও দ্রুত অবনতি ঘটে।
১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছিল, আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তখন চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১০৮। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৮ জন আক্রান্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৮৬ জনে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব কমেনি। নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালানোর দাবি থাকলেও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর অভিযান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত স্থাপনা, ছাদ, বারান্দা, খোলা জায়গা এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করছে। ফলে শুধু মশক নিধন কার্যক্রম নয়, এসব প্রজননস্থল চিহ্নিত করে পানি অপসারণ ও নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে নগরবাসীকেও নিজেদের বাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
মশারির ভেতরে রাখার পরামর্শ : চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতন হওয়া সবচেয়ে জরুরি। নিজেদের ঘরবাড়ি ও আঙিনায় কোথাও যেন পানি জমে মশার বংশবৃদ্ধি না ঘটে, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা গেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের মশারির ভেতরে রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আক্রান্ত রোগীকে মশারির বাইরে রাখা হলে তার শরীর থেকে মশার মাধ্যমে আশপাশের অন্য মানুষও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চট্টগ্রামে আগস্টে এক মাসে ১ হাজার ২০২ জন আক্রান্ত হওয়ার পর সেপ্টেম্বরেও প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত ও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন