জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

ভর্তুকির সার যাচ্ছে মিয়ানমারে



ভর্তুকির সার যাচ্ছে মিয়ানমারে

সরকার কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ভর্তুকি দেয় সারে। সেই ভর্তুকির সারই এবার দেশের সীমানা পেরিয়ে অবৈধ পথে যাচ্ছে মিয়ানমারে। সাগরপথে পাচারের সময় গত ছয় মাসে একের পর এক চালান আটক করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। শুধু জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসেই আটটি চালানে জব্দ হয়েছে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার।

কোস্ট গার্ডের অভিযানের তথ্য বলছে, এসব চালানে ইউরিয়া ও ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারের পাশাপাশি মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে সিমেন্ট ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যও বহন করা হচ্ছিল। কখনো ফিশিং বোট, কখনো কার্গো বোট—বিভিন্ন ধরনের নৌযান ব্যবহার করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূল থেকে এসব পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, কৃষকের জন্য নির্ধারিত ভর্তুকির সার কীভাবে দেশের উপকূল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে? কারা সংগ্রহ করছে এসব সার? কোন ডিলার বা সরবরাহব্যবস্থার ফাঁক ব্যবহার করে এগুলো পাচার হচ্ছে? আর এতগুলো চালান ধরা পড়লেও মূল হোতারা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে?

দুই মাসে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা : কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টে মিয়ানমারে পাচারের সময় আটটি চালানে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০০ বস্তা ডিএপি। বাকিগুলো ইউরিয়া সার। সাগর ও উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব চালান আটক করা হলেও পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং বিভিন্ন রুট ও নৌযান ব্যবহার করে পাচারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ ৩১ আগস্ট রাত ১টার দিকে কোস্ট গার্ড স্টেশন ভাটিয়ারীর উদ্যোগে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। একটি কার্গো বোট তল্লাশি করে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যায়।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, জব্দ করা ইউরিয়া সারের বাজারমূল্য প্রায় ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

এর মাত্র চার দিন আগে, ২৭ আগস্ট কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গার পৃথক অভিযানে দুটি কার্গো বোট থেকে ২৮০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ১ হাজার বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়।

১৬ আগস্ট কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থানার দক্ষিণ কুতুবদিয়া চ্যানেলে একটি ফিশিং বোট থেকে জব্দ করা হয় ৬০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ২৫০ বস্তা সিমেন্ট। কোস্ট গার্ডের ভাষ্য, এসব পণ্যও মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল।

জুলাইয়ে ধারাবাহিক চালান : জুলাই মাসেও সাগরপথে পাচারের একাধিক ঘটনা ধরা পড়ে। ৩১ জুলাই পতেঙ্গা এলাকায় দুটি ফিশিং বোটে অভিযান চালিয়ে ৪৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়। এ সময় দুটি বোটে থাকা ২৩ জনকে আটক করা হয়। ২৮ জুলাই নোয়াখালীর ভাসানচরের মাংগুরিয়ার চরসংলগ্ন এলাকায় একটি কার্গো বোট থেকে ৪৮০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। একই বোটে পাওয়া যায় ৩ হাজার ৭০০ কেজি ছোলা ও ৬ হাজার ৮৫০ কেজি বুটের ডাল।

২৪ জুলাই রাতে সীতাকুণ্ডের সন্দ্বীপ চ্যানেলসংলগ্ন এলাকায় একটি ফিশিং বোট ও একটি কার্গো বোটে তল্লাশি চালিয়ে ৩৮০ বস্তা সার ও ২৪০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ১০ জনকে আটক করা হয়।

এর আগে ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম বহির্নোঙর এলাকায় তিনটি কার্গো বোটে অভিযান চালিয়ে ২৫০ বস্তা ডিএপি সার ও ২ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। আটক করা হয় ২২ জনকে।

জুলাইয়ের শুরুতেও পাচারের চেষ্টা ধরা পড়ে। ২ জুলাই পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন এলাকায় একটি কাঠের বোট থেকে ৬০০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করা হয়।

কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ সার ও অন্যান্য পণ্য জব্দ হলেও অধিকাংশ ঘটনায় পাচারকারীদের মূল নেটওয়ার্কের তথ্য সামনে আসছে না। কোথা থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করা হয়, কার মাধ্যমে উপকূলে আসে এবং মিয়ানমারে কার কাছে পাঠানো হচ্ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরও স্পষ্ট নয়।  বিশেষ করে ভর্তুকির সার সরবরাহব্যবস্থার কোন স্তর থেকে এসব সার বেরিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, সরকার ইউরিয়া ও ডিএপিসহ চার ধরনের সারে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেয়। কোস্ট গার্ডের অভিযানে সার জব্দের বিষয়টি তারা বিভিন্ন সময় জানতে পারেন। তবে এসব সারের উৎস কোথায়, তা অনেক ক্ষেত্রে জানা যায় না।

তার ভাষ্য, চট্টগ্রামের কোনো ডিলার পয়েন্ট থেকে এসব সার মিয়ানমারে পাচারের তথ্য কৃষি বিভাগের কাছে নেই। সংশ্লিষ্ট ডিলার পয়েন্টগুলো তদারকির আওতায় রয়েছে।

এই বক্তব্যই পাচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—ডিলার পর্যায়ে তদারকি থাকলে ভর্তুকির সার কীভাবে উপকূলীয় এলাকায় গিয়ে পাচারকারীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে?

মিয়ানমার থেকে আসছে মাদক : বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে সার, সিমেন্ট ও অন্যান্য পণ্য পাচারের বিপরীতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসসহ বিভিন্ন মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, চোরাকারবারিরা শুধু সাগরপথ নয়, নদী ও স্থলসীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টও ব্যবহার করছে। এসব কর্মকাণ্ডে সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, নদী, সাগর ও স্থলপথের একাধিক পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে ঢুকছে। সাগরপথে মাদক ও অন্যান্য চোরাচালান ঠেকাতে কোস্ট গার্ড কাজ করছে। স্থলপথে বিজিবি, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরও কাজ করছে।

অর্থাৎ একদিকে বাংলাদেশ থেকে ভর্তুকির সার ও বিভিন্ন পণ্য বেরিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে একই সীমান্তব্যবস্থা ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে মাদক। ফলে বিষয়টি শুধু সার পাচারের নয়; এটি সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় একটি বড় চোরাচালান নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বৈধ বাণিজ্যের আড়ালে কি অবৈধ পাচার : টেকনাফ স্থলবন্দর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত মে মাসে আবার চালু হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে আলু, প্লাস্টিক পণ্য, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। বিপরীতে তেঁতুল, মাছ, সানাকামাটি, শুঁটকি, সুপারি ও নারিকেলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হচ্ছে।

টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এই স্থলবন্দর দিয়ে বৈধভাবে কোনো সার বা সিমেন্ট রপ্তানি হচ্ছে না।

তাহলে কোস্ট গার্ডের হাতে ধরা পড়া এসব সার ও সিমেন্ট কোন পথে মিয়ানমারে যাচ্ছে?

উত্তরটি মিলছে সাগরপথের অভিযানের তথ্যেই। দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে ছোট-বড় নৌযানে করে এসব পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দামের পার্থক্যেই বাড়ছে পাচারের ঝুঁকি : সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশে সরকার ভর্তুকি দেওয়ায় সারের দাম তুলনামূলক কম। অন্যদিকে প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতে একই ধরনের সারের দাম বেশি। ফলে দামের পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র অবৈধভাবে সার পাচার করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে।

এ ক্ষেত্রে শুধু পাচারকারীকে আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সারটি কোথা থেকে এসেছে, কোন পর্যায়ের সরবরাহব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, পরিবহন ও মজুদের সঙ্গে কারা জড়িত—এসব তথ্যও তদন্তে বের করা জরুরি।

কারণ সাগরে একটি বোট ধরা পড়ছে, কয়েকশ বস্তা সার জব্দ হচ্ছে; কিন্তু যদি সার সরবরাহের উৎস ও পাচারের মূল হোতাদের শনাক্ত করা না যায়, তাহলে একই চক্র নতুন নৌযান ও নতুন রুট ব্যবহার করে আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে।

সরকার কৃষকের জন্য যে ভর্তুকি দিচ্ছে, সেই সুবিধা যদি শেষ পর্যন্ত সীমান্তপারের কালোবাজারে চলে যায়, তাহলে ক্ষতি শুধু রাষ্ট্রের অর্থের নয়—কৃষকের অধিকার ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে।

আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ভর্তুকির সার যাচ্ছে মিয়ানমারে

প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সরকার কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ভর্তুকি দেয় সারে। সেই ভর্তুকির সারই এবার দেশের সীমানা পেরিয়ে অবৈধ পথে যাচ্ছে মিয়ানমারে। সাগরপথে পাচারের সময় গত ছয় মাসে একের পর এক চালান আটক করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। শুধু জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসেই আটটি চালানে জব্দ হয়েছে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার।

কোস্ট গার্ডের অভিযানের তথ্য বলছে, এসব চালানে ইউরিয়া ও ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারের পাশাপাশি মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে সিমেন্ট ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যও বহন করা হচ্ছিল। কখনো ফিশিং বোট, কখনো কার্গো বোট—বিভিন্ন ধরনের নৌযান ব্যবহার করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূল থেকে এসব পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, কৃষকের জন্য নির্ধারিত ভর্তুকির সার কীভাবে দেশের উপকূল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে? কারা সংগ্রহ করছে এসব সার? কোন ডিলার বা সরবরাহব্যবস্থার ফাঁক ব্যবহার করে এগুলো পাচার হচ্ছে? আর এতগুলো চালান ধরা পড়লেও মূল হোতারা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে?

দুই মাসে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা : কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টে মিয়ানমারে পাচারের সময় আটটি চালানে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০০ বস্তা ডিএপি। বাকিগুলো ইউরিয়া সার। সাগর ও উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব চালান আটক করা হলেও পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং বিভিন্ন রুট ও নৌযান ব্যবহার করে পাচারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ ৩১ আগস্ট রাত ১টার দিকে কোস্ট গার্ড স্টেশন ভাটিয়ারীর উদ্যোগে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। একটি কার্গো বোট তল্লাশি করে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যায়।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, জব্দ করা ইউরিয়া সারের বাজারমূল্য প্রায় ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

এর মাত্র চার দিন আগে, ২৭ আগস্ট কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গার পৃথক অভিযানে দুটি কার্গো বোট থেকে ২৮০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ১ হাজার বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়।

১৬ আগস্ট কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থানার দক্ষিণ কুতুবদিয়া চ্যানেলে একটি ফিশিং বোট থেকে জব্দ করা হয় ৬০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ২৫০ বস্তা সিমেন্ট। কোস্ট গার্ডের ভাষ্য, এসব পণ্যও মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল।

জুলাইয়ে ধারাবাহিক চালান : জুলাই মাসেও সাগরপথে পাচারের একাধিক ঘটনা ধরা পড়ে। ৩১ জুলাই পতেঙ্গা এলাকায় দুটি ফিশিং বোটে অভিযান চালিয়ে ৪৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়। এ সময় দুটি বোটে থাকা ২৩ জনকে আটক করা হয়। ২৮ জুলাই নোয়াখালীর ভাসানচরের মাংগুরিয়ার চরসংলগ্ন এলাকায় একটি কার্গো বোট থেকে ৪৮০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। একই বোটে পাওয়া যায় ৩ হাজার ৭০০ কেজি ছোলা ও ৬ হাজার ৮৫০ কেজি বুটের ডাল।

২৪ জুলাই রাতে সীতাকুণ্ডের সন্দ্বীপ চ্যানেলসংলগ্ন এলাকায় একটি ফিশিং বোট ও একটি কার্গো বোটে তল্লাশি চালিয়ে ৩৮০ বস্তা সার ও ২৪০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ১০ জনকে আটক করা হয়।

এর আগে ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম বহির্নোঙর এলাকায় তিনটি কার্গো বোটে অভিযান চালিয়ে ২৫০ বস্তা ডিএপি সার ও ২ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। আটক করা হয় ২২ জনকে।

জুলাইয়ের শুরুতেও পাচারের চেষ্টা ধরা পড়ে। ২ জুলাই পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন এলাকায় একটি কাঠের বোট থেকে ৬০০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করা হয়।

কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ সার ও অন্যান্য পণ্য জব্দ হলেও অধিকাংশ ঘটনায় পাচারকারীদের মূল নেটওয়ার্কের তথ্য সামনে আসছে না। কোথা থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করা হয়, কার মাধ্যমে উপকূলে আসে এবং মিয়ানমারে কার কাছে পাঠানো হচ্ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরও স্পষ্ট নয়।  বিশেষ করে ভর্তুকির সার সরবরাহব্যবস্থার কোন স্তর থেকে এসব সার বেরিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, সরকার ইউরিয়া ও ডিএপিসহ চার ধরনের সারে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেয়। কোস্ট গার্ডের অভিযানে সার জব্দের বিষয়টি তারা বিভিন্ন সময় জানতে পারেন। তবে এসব সারের উৎস কোথায়, তা অনেক ক্ষেত্রে জানা যায় না।

তার ভাষ্য, চট্টগ্রামের কোনো ডিলার পয়েন্ট থেকে এসব সার মিয়ানমারে পাচারের তথ্য কৃষি বিভাগের কাছে নেই। সংশ্লিষ্ট ডিলার পয়েন্টগুলো তদারকির আওতায় রয়েছে।

এই বক্তব্যই পাচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—ডিলার পর্যায়ে তদারকি থাকলে ভর্তুকির সার কীভাবে উপকূলীয় এলাকায় গিয়ে পাচারকারীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে?

মিয়ানমার থেকে আসছে মাদক : বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে সার, সিমেন্ট ও অন্যান্য পণ্য পাচারের বিপরীতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসসহ বিভিন্ন মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, চোরাকারবারিরা শুধু সাগরপথ নয়, নদী ও স্থলসীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টও ব্যবহার করছে। এসব কর্মকাণ্ডে সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, নদী, সাগর ও স্থলপথের একাধিক পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে ঢুকছে। সাগরপথে মাদক ও অন্যান্য চোরাচালান ঠেকাতে কোস্ট গার্ড কাজ করছে। স্থলপথে বিজিবি, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরও কাজ করছে।

অর্থাৎ একদিকে বাংলাদেশ থেকে ভর্তুকির সার ও বিভিন্ন পণ্য বেরিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে একই সীমান্তব্যবস্থা ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে মাদক। ফলে বিষয়টি শুধু সার পাচারের নয়; এটি সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় একটি বড় চোরাচালান নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বৈধ বাণিজ্যের আড়ালে কি অবৈধ পাচার : টেকনাফ স্থলবন্দর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত মে মাসে আবার চালু হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে আলু, প্লাস্টিক পণ্য, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। বিপরীতে তেঁতুল, মাছ, সানাকামাটি, শুঁটকি, সুপারি ও নারিকেলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হচ্ছে।

টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এই স্থলবন্দর দিয়ে বৈধভাবে কোনো সার বা সিমেন্ট রপ্তানি হচ্ছে না।

তাহলে কোস্ট গার্ডের হাতে ধরা পড়া এসব সার ও সিমেন্ট কোন পথে মিয়ানমারে যাচ্ছে?

উত্তরটি মিলছে সাগরপথের অভিযানের তথ্যেই। দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে ছোট-বড় নৌযানে করে এসব পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দামের পার্থক্যেই বাড়ছে পাচারের ঝুঁকি : সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশে সরকার ভর্তুকি দেওয়ায় সারের দাম তুলনামূলক কম। অন্যদিকে প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতে একই ধরনের সারের দাম বেশি। ফলে দামের পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র অবৈধভাবে সার পাচার করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে।

এ ক্ষেত্রে শুধু পাচারকারীকে আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সারটি কোথা থেকে এসেছে, কোন পর্যায়ের সরবরাহব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, পরিবহন ও মজুদের সঙ্গে কারা জড়িত—এসব তথ্যও তদন্তে বের করা জরুরি।

কারণ সাগরে একটি বোট ধরা পড়ছে, কয়েকশ বস্তা সার জব্দ হচ্ছে; কিন্তু যদি সার সরবরাহের উৎস ও পাচারের মূল হোতাদের শনাক্ত করা না যায়, তাহলে একই চক্র নতুন নৌযান ও নতুন রুট ব্যবহার করে আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে।

সরকার কৃষকের জন্য যে ভর্তুকি দিচ্ছে, সেই সুবিধা যদি শেষ পর্যন্ত সীমান্তপারের কালোবাজারে চলে যায়, তাহলে ক্ষতি শুধু রাষ্ট্রের অর্থের নয়—কৃষকের অধিকার ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে।


জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত