জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

১০১ সদস্যের বদলি, কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক-অসন্তোষ

এসপির হঠকারী সিদ্ধান্তে কক্সবাজার জেলা পুলিশে অস্থিরতা



এসপির হঠকারী সিদ্ধান্তে কক্সবাজার জেলা পুলিশে অস্থিরতা

কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি এবার জেলা পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অন্তত ৩৫ জন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ সুপারের হঠকারী সিদ্ধান্ত, অদক্ষতা, দুর্বল পুলিশিং এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয়ভীতি তৈরির কারণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি একসঙ্গে ১০১ পুলিশ সদস্যকে বদলি করার ঘটনায়ও নতুন করে ক্ষোভ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে ১০১ জন বদলি

সম্প্রতি গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে ১০১ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে ইন্সপেক্টর ৭ জন, এসআই ৩৬ জন, এএসআই ২৪ জন এবং কনস্টেবল ৩৪ জন। বদলি হওয়া সদস্যদের প্রায় ৯৫ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ, অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বেছে বেছে সরিয়ে দিয়ে তাঁদের জায়গায় তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ বদলি হওয়া কর্মকর্তারা এলাকার রাস্তাঘাট, অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানতেন এবং দ্রুত অভিযান পরিচালনায় সক্ষম ছিলেন।ফলে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ায় মাঠপর্যায়ের পুলিশিং দুর্বল হয়েছে বলে দাবি কর্মকর্তাদের।

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ সুপারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করায় অনেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি কথায় কথায় এসিআর ও সার্ভিস বুকে বিরূপ মন্তব্যের কারণে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে।

এসব কারণে জেলা পুলিশের মধ্যে আতঙ্ক, অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পড়ছে বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের।

আইনশৃঙ্খলা সভায় এসপির আচরণ নিয়েও ক্ষোভ

আইনশৃঙ্খলা কমিটির কয়েকজন সদস্যও পুলিশ সুপারের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে কোনো সদস্য বক্তব্য দিতে চাইলে পুলিশ সুপার অনেক সময় তাঁর বক্তব্য থামিয়ে নিজেই কথা বলতে শুরু করেন। এতে সভায় মুক্তভাবে মতামত দেওয়ার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সদস্যদের দাবি, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভাতেও পুলিশ সুপার মুঠোফোনে কথা বলেছেন এবং কখনো কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেছেন। এ নিয়ে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা জানান।

সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট একটি বৈঠকে পুলিশ সুপারের একই ধরনের আচরণে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা কমিটির এক সদস্য প্রশ্ন তোলেন, ‘যাঁর নিজের মধ্যেই ন্যূনতম শৃঙ্খলা নেই, তিনি কীভাবে একটি জেলার পুলিশ বাহিনীকে শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচালনা করবেন?’

আদালতের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন

আদালত চত্বরে বিচারককে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগের পরও ব্যবস্থা না নেওয়া এবং বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চিঠি দেওয়ার পরও গানম্যান না দেওয়ার অভিযোগও পুলিশের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক জানান, গত ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখান এক যুবক। বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

এরপর গত ২৪ মে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্য গোলাগুলিতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন। ফলে আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।

এসপির বক্তব্য

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘সারাদেশে প্রতি মাসে ৩০০টির মতো মার্ডার হয়। কক্সবাজারে ১৫ থেকে ২০টা হয়। সেটা আগে হয়েছিল, এখনো হচ্ছে। বেশিরভাগ মার্ডারই পরকীয়া ও পারিবারিক কারণে হচ্ছে। খুনের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।’

অন্য অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি কিছুটা বিরক্তির সুরে বলেন, ‘আমি তো অথর্ব এসপি। আপনাদের প্রিয় এসপি যখন ছিল, তখনো মার্ডার এমন হতো।’ এরপর তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।


আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


এসপির হঠকারী সিদ্ধান্তে কক্সবাজার জেলা পুলিশে অস্থিরতা

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি এবার জেলা পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অন্তত ৩৫ জন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ সুপারের হঠকারী সিদ্ধান্ত, অদক্ষতা, দুর্বল পুলিশিং এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয়ভীতি তৈরির কারণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি একসঙ্গে ১০১ পুলিশ সদস্যকে বদলি করার ঘটনায়ও নতুন করে ক্ষোভ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে ১০১ জন বদলি

সম্প্রতি গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে ১০১ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে ইন্সপেক্টর ৭ জন, এসআই ৩৬ জন, এএসআই ২৪ জন এবং কনস্টেবল ৩৪ জন। বদলি হওয়া সদস্যদের প্রায় ৯৫ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ, অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বেছে বেছে সরিয়ে দিয়ে তাঁদের জায়গায় তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ বদলি হওয়া কর্মকর্তারা এলাকার রাস্তাঘাট, অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানতেন এবং দ্রুত অভিযান পরিচালনায় সক্ষম ছিলেন।ফলে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ায় মাঠপর্যায়ের পুলিশিং দুর্বল হয়েছে বলে দাবি কর্মকর্তাদের।

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ সুপারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করায় অনেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি কথায় কথায় এসিআর ও সার্ভিস বুকে বিরূপ মন্তব্যের কারণে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে।

এসব কারণে জেলা পুলিশের মধ্যে আতঙ্ক, অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পড়ছে বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের।

আইনশৃঙ্খলা সভায় এসপির আচরণ নিয়েও ক্ষোভ

আইনশৃঙ্খলা কমিটির কয়েকজন সদস্যও পুলিশ সুপারের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে কোনো সদস্য বক্তব্য দিতে চাইলে পুলিশ সুপার অনেক সময় তাঁর বক্তব্য থামিয়ে নিজেই কথা বলতে শুরু করেন। এতে সভায় মুক্তভাবে মতামত দেওয়ার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সদস্যদের দাবি, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভাতেও পুলিশ সুপার মুঠোফোনে কথা বলেছেন এবং কখনো কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেছেন। এ নিয়ে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা জানান।

সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট একটি বৈঠকে পুলিশ সুপারের একই ধরনের আচরণে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা কমিটির এক সদস্য প্রশ্ন তোলেন, ‘যাঁর নিজের মধ্যেই ন্যূনতম শৃঙ্খলা নেই, তিনি কীভাবে একটি জেলার পুলিশ বাহিনীকে শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচালনা করবেন?’

আদালতের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন

আদালত চত্বরে বিচারককে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগের পরও ব্যবস্থা না নেওয়া এবং বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চিঠি দেওয়ার পরও গানম্যান না দেওয়ার অভিযোগও পুলিশের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক জানান, গত ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখান এক যুবক। বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

এরপর গত ২৪ মে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্য গোলাগুলিতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন। ফলে আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।

এসপির বক্তব্য

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘সারাদেশে প্রতি মাসে ৩০০টির মতো মার্ডার হয়। কক্সবাজারে ১৫ থেকে ২০টা হয়। সেটা আগে হয়েছিল, এখনো হচ্ছে। বেশিরভাগ মার্ডারই পরকীয়া ও পারিবারিক কারণে হচ্ছে। খুনের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।’

অন্য অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি কিছুটা বিরক্তির সুরে বলেন, ‘আমি তো অথর্ব এসপি। আপনাদের প্রিয় এসপি যখন ছিল, তখনো মার্ডার এমন হতো।’ এরপর তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।



জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত