জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

মেট্রোরেল ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ

সিঁড়ি থেকে নামলেই ছিনতাইয়ের ফাঁদ



সিঁড়ি থেকে নামলেই ছিনতাইয়ের ফাঁদ

* জনবল ঘাটতির কারণে তিন শিফটে পূর্ণাঙ্গ নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না

* সিঁড়ি থেকে ফুটপাত পর্যন্ত অংশটি অপরাধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হয়ে উঠছে

* যাত্রী বের হওয়ার পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং অপরাধের পর পালানোর সুযোগ বাড়ছে

মেট্রোরেলের প্ল্যাটফর্মে ঢোকার মুখে নিয়মিত তল্লাশির নিয়ম থাকলেও আদতে ভেতরে প্রবেশের প্রতিটি ধাপেই চোখে পড়ে শিথিল চিত্র। প্রবেশপথের আর্চওয়ে বিকল, লাগেজ পরীক্ষার আধুনিক সরঞ্জামের সংকট আর পুলিশের চরম জনবল ঘাটতিতে প্রবেশপথ, টিকিট কাউন্টার ও প্ল্যাটফর্ম—কোথাওই নিয়মিত তল্লাশি ও সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু ভেতরে এই দুর্বল নজরদারির ধাক্কা সামলে ট্রেন থেকে নেমে একজন যাত্রী যখন স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে নিচের সড়কে পৌঁছাচ্ছেন, তখন তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে নতুন ও সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি—ছিনতাই, পকেটমারি এবং অবৈধ যানবাহনের চরম বিশৃঙ্খলা।

সাম্প্রতিক কয়েকটি অপরাধমূলক ঘটনা এবং মেট্রোরেলের সার্বিক নিরাপত্তাকাঠামোর নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আধুনিক গণপরিবহনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং স্টেশনের বাইরের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে একটি বড় ধরনের 'নিরাপত্তা শূন্যতা' তৈরি হয়েছে। একদিকে স্টেশনের অভ্যন্তরে পুলিশ সদস্যের ঘাটতি ও নড়বড়ে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, অন্যদিকে স্টেশনের নিচে নেমেই হকারদের ফুটপাত দখল, রিকশা-অটোরিকশার স্থায়ী জটলা এবং ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারী চক্রের উপস্থিতি। ফলে রাজধানীবাসীর স্বস্তির বাহনটি ব্যবহারের সময় প্ল্যাটফর্ম থেকে সড়ক পর্যন্ত পুরো পথেই তৈরি হচ্ছে অজানা আতঙ্ক।

মেট্রোরেল স্টেশনগুলোর চারপাশের নিরাপত্তাবেষ্টনী কতটা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে, তা স্পষ্ট হয় সম্প্রতি মতিঝিল স্টেশনের নিচের ঘটনার মধ্য দিয়ে। গত জুলাই মাসে ব্যস্ত এই স্টেশনের নিচের ফুটপাতে ছাতার ভেতর রাখা একটি শক্তিশালী বিস্ফোরক উদ্ধার করে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। স্টেশনের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য বিষয়টি প্রথম আঁচ করতে পেরে এমআরটি পুলিশ ও স্টেশন কন্ট্রোলারকে জানালে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়। ঘটনাটি ট্রেনের ভেতরে না ঘটলেও এটি এমন এক স্থানে ঘটেছিল, যা ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ওঠানামা করেন। ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ছিনতাই ছিল না, বরং তা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্টেশনের নিচের সড়ক ও ফুটপাতের সার্বিক নিরাপত্তা বলয় কতটা নড়বড়ে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিরাপত্তাব্যবস্থার এই গলদের নেপথ্যে রয়েছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয় জনবলের চরম অভাব। ১৬টি স্টেশনের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গঠিত এমআরটি (মেট্রোরেল) পুলিশ এখনো পূর্ণাঙ্গ শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে পারেনি। পুলিশি হিসাব অনুযায়ী, দিনে তিন শিফটে দায়িত্ব পালনের জন্য ন্যূনতম ৪৮০ জন পুলিশ সদস্য প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে এই মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন অনেক কম সদস্য। মতিঝিল বা উত্তরার মতো তুলনামূলক ব্যস্ত স্টেশনগুলোতে প্রতি শিফটে ৯ থেকে ১০ জন সদস্যকে দেখা গেলেও অন্য অধিকাংশ স্টেশনে কর্মরত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা এর চেয়েও কম।

শুধু জনবল ঘাটতি নয়, প্রযুক্তির দিকেও রয়েছে বড় ধরনের স্থবিরতা। সচিবালয় ও উত্তরা উত্তর স্টেশনের মতো স্পর্শকাতর স্থানে থাকা আটটি আর্চওয়ের মধ্যে অন্তত চারটি অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে এই পথগুলো দিয়ে যাত্রীরা প্রবেশের সময় কোনো ধাতব বস্তু বহন করছেন কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্তের সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনের প্রবেশমুখে আধুনিক লাগেজ স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কাগজ-কলমেই আটকে আছে।

স্টেশনের অভ্যন্তরের এই ঘাটতি কাটিয়ে যখন যাত্রীরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন, তখন দ্বিতীয় ধাপে নিরাপত্তা সংকট আরও ঘনীভূত হয়। সাধারণত ট্রেন থেকে নামার পর যাত্রীরা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে মোবাইল বের করেন, গন্তব্যের পথ দেখেন অথবা রিকশা খুঁজতে থাকেন। ঠিক এই মুহূর্তটিতেই পথচারীদের জটলাকে কাজে লাগায় পেশাদার অপরাধী চক্র।

পল্লবী, মিরপুর-১০, ফার্মগেট এবং মতিঝিল স্টেশনের নিচে সরেজমিনে দেখা যায়, স্টেশনের সিঁড়ি যেখানে এসে ঠেকেছে, ঠিক সেই ফুটপাতেই বসেছে হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকান। কোথাও আবার সিঁড়ির মুখেই গড়ে উঠেছে অঘোষিত রিকশা ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড। ফলে স্বাভাবিক চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে কৃত্রিম জটলার সৃষ্টি হচ্ছে। এই কৃত্রিম জটলাই ছিনতাইকারী ও পকেটমারদের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। অপরাধীরা খুব অল্প সময়ে যাত্রীর হাতে থাকা ফোন, গলার চেইন বা পকেটের মানিব্যাগ টান মেরে নিমিষেই ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে পারছে। জটলা ও অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে ভুক্তভোগী কিংবা উপস্থিত পথচারীদের পক্ষে অপরাধীকে ধাওয়া দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

এটি কেবলই একটি সাময়িক আশঙ্কা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে একাধিক সুনির্দিষ্ট ঘটনা। এর আগে পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের ফুটপাত থেকে এক যুবকের দামী আইফোন ছিনতাইয়ের ঘটনার পর র‍্যাব দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের কাছ থেকে চারটি চোরাই মোবাইল উদ্ধার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, অপরাধীরা অটোরিকশায় ঘুরে ঘুরে মূলত ট্রেন থেকে নেমে আসা যাত্রীদের টার্গেট করত।

একইভাবে ইতিপূর্বে মেট্রোরেল স্টেশন থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এক ছিনতাইকারী পুলিশকে জানিয়েছে, তাঁরা আগে গণপরিবহনের নারীদের ব্যাগ বা মোবাইল টান মারতেন। কিন্তু মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর যাত্রীদের একটি বড় অংশ তুলনামূলক শিথিল ও অসতর্ক থাকেন বলে চক্রটি তাঁদের কৌশল বদলে সরাসরি মেট্রোস্টেশনের সিঁড়ির নিচে অবস্থান নেওয়া শুরু করে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটির মূল জট লেগে আছে দায়িত্বের বহুধা বিভক্তিতে। মেট্রোরেল কাঠামোর ভেতরে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে এমআরটি পুলিশ। স্টেশনের নিচের সড়ক ও আশপাশের মূল এলাকার দায়িত্বে ডিএমপি (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ)। আবার ফুটপাতের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ ও চলাচলের পথ সুগম করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের, আর যানবাহনের শৃঙ্খলার দায় ট্রাফিক বিভাগের।

আইনশৃঙ্খলা ও সেবা সংস্থাগুলোর এই নানামুখী কাঠামোর কারণে একজন যাত্রী স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার পর ঠিক কার নজরদারিতে আছেন, তা স্পষ্ট নয়। এক সংস্থার সঙ্গে অন্য সংস্থার নিয়মিত সমন্বয় না থাকায় অপরাধীরা স্টেশনের সীমানা ও সড়কের মধ্যবর্তী এই ফাঁকা জায়গাকে নিজেদের নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোরেলে যাতায়াতকারী হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্টেশনের ভেতরে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি সচল করার পাশাপাশি অবিলম্বে পর্যাপ্ত এমআরটি পুলিশ মোতায়েন করতে হবে। একই সঙ্গে সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে স্টেশনের নিচের ফুটপাত হকারমুক্ত করা এবং নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে অটোরিকশা বা যানবাহনের জটলা তৈরি বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। যাত্রীর নিরাপত্তা কেবল ট্রেনের ভেতরের গণ্ডিতে আটকে থাকলে চলবে না; স্টেশনের বাইরে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সেই সুরক্ষাবলয় সম্প্রসারিত করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সিঁড়ি থেকে নামলেই ছিনতাইয়ের ফাঁদ

প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

* জনবল ঘাটতির কারণে তিন শিফটে পূর্ণাঙ্গ নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না

* সিঁড়ি থেকে ফুটপাত পর্যন্ত অংশটি অপরাধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হয়ে উঠছে

* যাত্রী বের হওয়ার পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং অপরাধের পর পালানোর সুযোগ বাড়ছে

মেট্রোরেলের প্ল্যাটফর্মে ঢোকার মুখে নিয়মিত তল্লাশির নিয়ম থাকলেও আদতে ভেতরে প্রবেশের প্রতিটি ধাপেই চোখে পড়ে শিথিল চিত্র। প্রবেশপথের আর্চওয়ে বিকল, লাগেজ পরীক্ষার আধুনিক সরঞ্জামের সংকট আর পুলিশের চরম জনবল ঘাটতিতে প্রবেশপথ, টিকিট কাউন্টার ও প্ল্যাটফর্ম—কোথাওই নিয়মিত তল্লাশি ও সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু ভেতরে এই দুর্বল নজরদারির ধাক্কা সামলে ট্রেন থেকে নেমে একজন যাত্রী যখন স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে নিচের সড়কে পৌঁছাচ্ছেন, তখন তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে নতুন ও সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি—ছিনতাই, পকেটমারি এবং অবৈধ যানবাহনের চরম বিশৃঙ্খলা।

সাম্প্রতিক কয়েকটি অপরাধমূলক ঘটনা এবং মেট্রোরেলের সার্বিক নিরাপত্তাকাঠামোর নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আধুনিক গণপরিবহনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং স্টেশনের বাইরের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে একটি বড় ধরনের 'নিরাপত্তা শূন্যতা' তৈরি হয়েছে। একদিকে স্টেশনের অভ্যন্তরে পুলিশ সদস্যের ঘাটতি ও নড়বড়ে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, অন্যদিকে স্টেশনের নিচে নেমেই হকারদের ফুটপাত দখল, রিকশা-অটোরিকশার স্থায়ী জটলা এবং ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারী চক্রের উপস্থিতি। ফলে রাজধানীবাসীর স্বস্তির বাহনটি ব্যবহারের সময় প্ল্যাটফর্ম থেকে সড়ক পর্যন্ত পুরো পথেই তৈরি হচ্ছে অজানা আতঙ্ক।

মেট্রোরেল স্টেশনগুলোর চারপাশের নিরাপত্তাবেষ্টনী কতটা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে, তা স্পষ্ট হয় সম্প্রতি মতিঝিল স্টেশনের নিচের ঘটনার মধ্য দিয়ে। গত জুলাই মাসে ব্যস্ত এই স্টেশনের নিচের ফুটপাতে ছাতার ভেতর রাখা একটি শক্তিশালী বিস্ফোরক উদ্ধার করে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। স্টেশনের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য বিষয়টি প্রথম আঁচ করতে পেরে এমআরটি পুলিশ ও স্টেশন কন্ট্রোলারকে জানালে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়। ঘটনাটি ট্রেনের ভেতরে না ঘটলেও এটি এমন এক স্থানে ঘটেছিল, যা ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ওঠানামা করেন। ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ছিনতাই ছিল না, বরং তা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্টেশনের নিচের সড়ক ও ফুটপাতের সার্বিক নিরাপত্তা বলয় কতটা নড়বড়ে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিরাপত্তাব্যবস্থার এই গলদের নেপথ্যে রয়েছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয় জনবলের চরম অভাব। ১৬টি স্টেশনের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গঠিত এমআরটি (মেট্রোরেল) পুলিশ এখনো পূর্ণাঙ্গ শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে পারেনি। পুলিশি হিসাব অনুযায়ী, দিনে তিন শিফটে দায়িত্ব পালনের জন্য ন্যূনতম ৪৮০ জন পুলিশ সদস্য প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে এই মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন অনেক কম সদস্য। মতিঝিল বা উত্তরার মতো তুলনামূলক ব্যস্ত স্টেশনগুলোতে প্রতি শিফটে ৯ থেকে ১০ জন সদস্যকে দেখা গেলেও অন্য অধিকাংশ স্টেশনে কর্মরত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা এর চেয়েও কম।

শুধু জনবল ঘাটতি নয়, প্রযুক্তির দিকেও রয়েছে বড় ধরনের স্থবিরতা। সচিবালয় ও উত্তরা উত্তর স্টেশনের মতো স্পর্শকাতর স্থানে থাকা আটটি আর্চওয়ের মধ্যে অন্তত চারটি অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে এই পথগুলো দিয়ে যাত্রীরা প্রবেশের সময় কোনো ধাতব বস্তু বহন করছেন কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্তের সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনের প্রবেশমুখে আধুনিক লাগেজ স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কাগজ-কলমেই আটকে আছে।

স্টেশনের অভ্যন্তরের এই ঘাটতি কাটিয়ে যখন যাত্রীরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন, তখন দ্বিতীয় ধাপে নিরাপত্তা সংকট আরও ঘনীভূত হয়। সাধারণত ট্রেন থেকে নামার পর যাত্রীরা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে মোবাইল বের করেন, গন্তব্যের পথ দেখেন অথবা রিকশা খুঁজতে থাকেন। ঠিক এই মুহূর্তটিতেই পথচারীদের জটলাকে কাজে লাগায় পেশাদার অপরাধী চক্র।

পল্লবী, মিরপুর-১০, ফার্মগেট এবং মতিঝিল স্টেশনের নিচে সরেজমিনে দেখা যায়, স্টেশনের সিঁড়ি যেখানে এসে ঠেকেছে, ঠিক সেই ফুটপাতেই বসেছে হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকান। কোথাও আবার সিঁড়ির মুখেই গড়ে উঠেছে অঘোষিত রিকশা ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড। ফলে স্বাভাবিক চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে কৃত্রিম জটলার সৃষ্টি হচ্ছে। এই কৃত্রিম জটলাই ছিনতাইকারী ও পকেটমারদের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। অপরাধীরা খুব অল্প সময়ে যাত্রীর হাতে থাকা ফোন, গলার চেইন বা পকেটের মানিব্যাগ টান মেরে নিমিষেই ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে পারছে। জটলা ও অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে ভুক্তভোগী কিংবা উপস্থিত পথচারীদের পক্ষে অপরাধীকে ধাওয়া দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

এটি কেবলই একটি সাময়িক আশঙ্কা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে একাধিক সুনির্দিষ্ট ঘটনা। এর আগে পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের ফুটপাত থেকে এক যুবকের দামী আইফোন ছিনতাইয়ের ঘটনার পর র‍্যাব দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের কাছ থেকে চারটি চোরাই মোবাইল উদ্ধার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, অপরাধীরা অটোরিকশায় ঘুরে ঘুরে মূলত ট্রেন থেকে নেমে আসা যাত্রীদের টার্গেট করত।

একইভাবে ইতিপূর্বে মেট্রোরেল স্টেশন থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এক ছিনতাইকারী পুলিশকে জানিয়েছে, তাঁরা আগে গণপরিবহনের নারীদের ব্যাগ বা মোবাইল টান মারতেন। কিন্তু মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর যাত্রীদের একটি বড় অংশ তুলনামূলক শিথিল ও অসতর্ক থাকেন বলে চক্রটি তাঁদের কৌশল বদলে সরাসরি মেট্রোস্টেশনের সিঁড়ির নিচে অবস্থান নেওয়া শুরু করে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটির মূল জট লেগে আছে দায়িত্বের বহুধা বিভক্তিতে। মেট্রোরেল কাঠামোর ভেতরে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে এমআরটি পুলিশ। স্টেশনের নিচের সড়ক ও আশপাশের মূল এলাকার দায়িত্বে ডিএমপি (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ)। আবার ফুটপাতের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ ও চলাচলের পথ সুগম করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের, আর যানবাহনের শৃঙ্খলার দায় ট্রাফিক বিভাগের।

আইনশৃঙ্খলা ও সেবা সংস্থাগুলোর এই নানামুখী কাঠামোর কারণে একজন যাত্রী স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার পর ঠিক কার নজরদারিতে আছেন, তা স্পষ্ট নয়। এক সংস্থার সঙ্গে অন্য সংস্থার নিয়মিত সমন্বয় না থাকায় অপরাধীরা স্টেশনের সীমানা ও সড়কের মধ্যবর্তী এই ফাঁকা জায়গাকে নিজেদের নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোরেলে যাতায়াতকারী হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্টেশনের ভেতরে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি সচল করার পাশাপাশি অবিলম্বে পর্যাপ্ত এমআরটি পুলিশ মোতায়েন করতে হবে। একই সঙ্গে সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে স্টেশনের নিচের ফুটপাত হকারমুক্ত করা এবং নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে অটোরিকশা বা যানবাহনের জটলা তৈরি বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। যাত্রীর নিরাপত্তা কেবল ট্রেনের ভেতরের গণ্ডিতে আটকে থাকলে চলবে না; স্টেশনের বাইরে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সেই সুরক্ষাবলয় সম্প্রসারিত করতে হবে।


জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত