জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীকে হয়রানির অভিযোগ

এসআই ইয়াছিনের ‘ক্রসফায়ার’ ফাঁদ



এসআই ইয়াছিনের ‘ক্রসফায়ার’ ফাঁদ

আইনশৃঙ্খলার রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন সাধারণ নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও ধসে পড়ে। ঠিক তেমনি এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বন্দর থানার সাবেক ও বর্তমানে হালিশহর থানায় কর্মরত সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই) মো. ইয়াছিনের বিরুদ্ধে।

ক্ষমতার অপব্যবহার, ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন ঘুষ হিসেবে গ্রহণ, মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি এবং কাঙ্ক্ষিত অর্থ না পেয়ে এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীকে সাজানো মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এখন সিএমপি কমিশনারের দপ্তরে। অভিযোগকারী ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অর্থ লেনদেনের একাধিক স্পষ্ট অডিও রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ও আনুষঙ্গিক নথিপত্র ইতিমধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেছে।

 ঘটনার বিবরণে জানা যায়, বন্দর এলাকার বারিক বিল্ডিং সাবের প্লাজার চতুর্থ তলায় ‘আইনসম্মত’ ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন মো. নূর উদ্দিন। তিনি একজন নিয়মিত করদাতা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২৫-২০২৬ কর নির্ধারণী বছরের সনদধারী ব্যবসায়ী। ব্যবসার প্রয়োজনে কার্যালয়ে যাতায়াতের সুবাদে বন্দর থানায় তৎকালীন কর্মরত এসআই ইয়াছিনের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। 

অভিযোগ রয়েছে, এই সখ্যকে পুঁজি করে পুলিশি ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে নিজের ব্যক্তিগত ফায়দা লোটা শুরু করেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। ইয়াছিন নিজের ব্যবহারের ফোনটি নষ্ট হয়ে গেছে জানিয়ে ইয়াছিনকে একটি নতুন ফোন কিনে দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং পরবর্তীতে টাকা শোধ করে দেবেন বলে আশ্বস্ত করেন। পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে ঝামেলা এড়াতে ব্যবসায়ী নূর উদ্দিন ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ব্যয় করে একটি নামীদামি মোবাইল সেট কিনে ইয়াছিনের হাতে তুলে দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও সেই মোবাইল সেটের মূল্যের অর্থ আর ফেরত দেওয়া হয়নি। বরং দিন দিন অর্থ দাবির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। 

নূর উদ্দিনের দেওয়া লিখিত অভিযোগ বিবরণী থেকে জানা যায়, চাহিদামতো টাকা না পেয়ে একপর্যায়ে কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িচালক বিপ্লবকে থানায় তুলে নিয়ে যান এসআই ইয়াছিন। তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার বিনিময়ে তৎকালীন সময়ে দাবি করা হয় ১ লাখ টাকা। শর্ত দেওয়া হয়, এই টাকা না দিলে চালককে চার থেকে পাঁচটি মারাত্মক ফৌজদারি মামলায় আসামি করা হবে। পরবর্তীতে চালককে বাঁচাতে নূর উদ্দিন তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা শোধ করতে বাধ্য হন। কিন্তু এতকিছুর পরও নিস্তার মেলেনি; টাকা নেওয়ার পরও চালক বিপ্লবকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৮ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়। এরপরও ব্ল্যাকমেইলিং থামেনি। বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যবসায়ী নূর উদ্দিনের কাছ থেকে অর্থ আদায় অব্যাহত রাখা হয়। 

গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আবারও ইয়াছিনকে ২১ হাজার টাকা প্রদান করেন নূর উদ্দিন, যা কৌশলে তিনি ধারণ করে রাখেন। প্রতিনিয়ত পুলিশি হয়রানি ও আর্থিক শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে ব্যবসায়ী নূর উদ্দিন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করার উদ্যোগ নিলে তাকে মারাত্মক পরিণতির হুমকি দেওয়া হয়। 

অভিযোগে বলা হয়, নূর উদ্দিন আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে সরাসরি ‘ক্রসফায়ারে’ দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেন এসআই ইয়াছিন। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে গত ১৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পুলিশ কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকের বরাবর ঘটনার বিবরণ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।

 তবে এই লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরই প্রতিহিংসার শিকার হতে হয় ওই ব্যবসায়ীকে। নূর উদ্দিন অভিযোগ করেন, লিখিত আবেদনের খবর পেতেই তাঁর বিরুদ্ধে একটি সাজানো মামলা দায়েরের পাঁয়তারা করা হয়। সেই নীল নকশা অনুযায়ী, গত ১১ মে ২০২৬ তারিখে বন্দর থানায় দায়ের হওয়া ১৪ নম্বর মামলায় নূর উদ্দিন ও তাঁর চালক বিপ্লবকে আসামী করে মামলা সাজানো হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয় চোরাই ও অবৈধ মালামাল জব্দের কথা, যার সাথে তাঁর কোনো ধরনের দূরতম সম্পৃক্ততাও ছিল না। সম্ভাব্য হয়রানির বিষয়টি আঁচ করতে পেরে এর আগেই থানায় জিডি ও অভিযোগ করা সত্ত্বেও পুলিশি প্রভাব ব্যবহার করে তাঁকে চুরির মামলায় জড়ানো হয়।

 অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মামলাটির বাদী মোহাম্মদ জামাল হোসেন মূলত এসআই ইয়াছিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং অনুগত এক সহযোগী। নির্ভরযোগ্য তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, জামাল হোসেন কোনো সৎ ব্যবসায়ী নন, বরং তিনি নিজে একজন চিহ্নিত চোর ও সাজাপ্রাপ্ত দাগি আসামি। বন্দর থানার এফআইআর নম্বর-১২ (তারিখ: ১৮ মার্চ ২০২৪)-এর নথিপত্রে প্রমাণ পাওয়া যায়, দণ্ডবিধির ৪০৭ ও ১০৯ ধারায় একটি চোরাচালান মামলায় জামাল হোসেনকে পূর্বে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। সেখানে অভিযোগ ছিল, বিদেশে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা গার্মেন্টস পণ্য কাভার্ডভ্যান থেকে আত্মসাৎ করে তা চোরারাজারে বিক্রি করা। ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চার্জশিট দেওয়া হয়। এসআই ইয়াছিন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এমন এক চিহ্নিত চোরাকারবারিকে ‘ব্যবসায়ী’ বানিয়ে বাদী হিসেবে ব্যবহার করে নূর উদ্দিনকে সাজানো মামলায় ফাঁসিয়েছেন বলে প্রমাণ মিলেছে।

 অর্থ লেনদেনের সপক্ষে সময়ের প্রয়াস-এর প্রতিবেদকের হাতে আসা অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ে জালিয়াতির একাধিক প্রমাণ উঠে এসেছে। একটি ৪৯ সেকেন্ডের অডিও রেকর্ডে স্পষ্টভাবে এসআই ইয়াছিনের গলায় বলতে শোনা যায়, “ভাইয়েরে দিতে হয়বো তো। সেদিনই তো কইলাম ভাইয়ের দরকার বেশি।” উত্তরে ব্যবসায়ী নূর উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বলছি তো।” কথোপকথনের শেষ দিকে ৫০ হাজার টাকা হস্তান্তরের বিষয়টি উঠে আসে এবং ইয়াছিন আশ্বস্ত করেন, “ভাই, ওয়াদা করছি, কাজ করে দেওয়া।” এ ছাড়া অন্য একটি ভিডিও ক্লিপে সরাসরি পুলিশ কর্মকর্তার হাতে টাকা দেওয়ার দৃশ্য এবং টাকা লেনদেনের সময় কাজ করে দেওয়ার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রেকর্ড রয়েছে।

 কেবল মামলা দেওয়াতেই ক্ষান্ত হননি চক্রটি, মামলাটি মীমাংসা বা তুলে নেওয়ার নাম করেও নূর উদ্দিনের থেকে পুনরায় কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। বাদী জামাল হোসেনের সঙ্গে নূর উদ্দিনের অডিও কথোপকথনে জামালকে স্বীকার করতে শোনা যায়, তিনি ইতিমধ্যেই ২ লাখ টাকা বুঝে পেয়েছেন। তবে মামলা প্রত্যাহার বা আপসের পূর্বশর্ত হিসেবে জামাল দাবি করেন, এসআই ইয়াছিনের বিরুদ্ধে সিএমপি কার্যালয়ে যে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, তা আগে তুলে নিতে হবে। ভুক্তভোগী নূর উদ্দিন জানান, মিথ্যা মামলা দিয়ে শুধু অর্থই আত্মসাৎ করা হয়নি, দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্মান ও ব্যবসায়ের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।

 এসব বিস্ফোরক অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে এসআই মো. ইয়াছিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে ঘোরানোর চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, নূর উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় বন্দর থানা সূত্রে এবং মূলত গাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত একটি হিসাবের বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে আর্থিক বকেয়া ছিল। ইয়াছিন বলেন, তিনি বা তাঁর ভাই গাড়ি ভাড়া দিতেন এবং সেই ভাড়ার বকেয়া টাকা পরিশোধের সময় হয়তো নূর উদ্দিন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিও করে রেখেছিলেন।

 অন্যদিকে, নগর পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পুলিশের অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) নগরীর দামপাড়ায় সিএমপির ‘ওপেন হাউজ ডে’ কর্মসূচিতে বক্তব্য প্রদানকালে পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্পষ্ট বার্তা দেন। তিনি জানান, নগরবাসীর যেকোনো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক সমাধান করা হবে। পুলিশের যেকোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম, দুর্নীতি বা চাঁদাবাজির সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না এবং কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেবাপ্রত্যাশীদের ওপর কোনো প্রকার হয়রানি মেনে নেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।

আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬


এসআই ইয়াছিনের ‘ক্রসফায়ার’ ফাঁদ

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

আইনশৃঙ্খলার রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন সাধারণ নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও ধসে পড়ে। ঠিক তেমনি এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বন্দর থানার সাবেক ও বর্তমানে হালিশহর থানায় কর্মরত সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই) মো. ইয়াছিনের বিরুদ্ধে।

ক্ষমতার অপব্যবহার, ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন ঘুষ হিসেবে গ্রহণ, মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি এবং কাঙ্ক্ষিত অর্থ না পেয়ে এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীকে সাজানো মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এখন সিএমপি কমিশনারের দপ্তরে। অভিযোগকারী ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অর্থ লেনদেনের একাধিক স্পষ্ট অডিও রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ও আনুষঙ্গিক নথিপত্র ইতিমধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেছে।

 ঘটনার বিবরণে জানা যায়, বন্দর এলাকার বারিক বিল্ডিং সাবের প্লাজার চতুর্থ তলায় ‘আইনসম্মত’ ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন মো. নূর উদ্দিন। তিনি একজন নিয়মিত করদাতা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২৫-২০২৬ কর নির্ধারণী বছরের সনদধারী ব্যবসায়ী। ব্যবসার প্রয়োজনে কার্যালয়ে যাতায়াতের সুবাদে বন্দর থানায় তৎকালীন কর্মরত এসআই ইয়াছিনের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। 

অভিযোগ রয়েছে, এই সখ্যকে পুঁজি করে পুলিশি ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে নিজের ব্যক্তিগত ফায়দা লোটা শুরু করেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। ইয়াছিন নিজের ব্যবহারের ফোনটি নষ্ট হয়ে গেছে জানিয়ে ইয়াছিনকে একটি নতুন ফোন কিনে দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং পরবর্তীতে টাকা শোধ করে দেবেন বলে আশ্বস্ত করেন। পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে ঝামেলা এড়াতে ব্যবসায়ী নূর উদ্দিন ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ব্যয় করে একটি নামীদামি মোবাইল সেট কিনে ইয়াছিনের হাতে তুলে দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও সেই মোবাইল সেটের মূল্যের অর্থ আর ফেরত দেওয়া হয়নি। বরং দিন দিন অর্থ দাবির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। 

নূর উদ্দিনের দেওয়া লিখিত অভিযোগ বিবরণী থেকে জানা যায়, চাহিদামতো টাকা না পেয়ে একপর্যায়ে কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িচালক বিপ্লবকে থানায় তুলে নিয়ে যান এসআই ইয়াছিন। তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার বিনিময়ে তৎকালীন সময়ে দাবি করা হয় ১ লাখ টাকা। শর্ত দেওয়া হয়, এই টাকা না দিলে চালককে চার থেকে পাঁচটি মারাত্মক ফৌজদারি মামলায় আসামি করা হবে। পরবর্তীতে চালককে বাঁচাতে নূর উদ্দিন তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা শোধ করতে বাধ্য হন। কিন্তু এতকিছুর পরও নিস্তার মেলেনি; টাকা নেওয়ার পরও চালক বিপ্লবকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৮ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়। এরপরও ব্ল্যাকমেইলিং থামেনি। বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যবসায়ী নূর উদ্দিনের কাছ থেকে অর্থ আদায় অব্যাহত রাখা হয়। 

গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আবারও ইয়াছিনকে ২১ হাজার টাকা প্রদান করেন নূর উদ্দিন, যা কৌশলে তিনি ধারণ করে রাখেন। প্রতিনিয়ত পুলিশি হয়রানি ও আর্থিক শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে ব্যবসায়ী নূর উদ্দিন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করার উদ্যোগ নিলে তাকে মারাত্মক পরিণতির হুমকি দেওয়া হয়। 

অভিযোগে বলা হয়, নূর উদ্দিন আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে সরাসরি ‘ক্রসফায়ারে’ দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেন এসআই ইয়াছিন। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে গত ১৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পুলিশ কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকের বরাবর ঘটনার বিবরণ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।

 তবে এই লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরই প্রতিহিংসার শিকার হতে হয় ওই ব্যবসায়ীকে। নূর উদ্দিন অভিযোগ করেন, লিখিত আবেদনের খবর পেতেই তাঁর বিরুদ্ধে একটি সাজানো মামলা দায়েরের পাঁয়তারা করা হয়। সেই নীল নকশা অনুযায়ী, গত ১১ মে ২০২৬ তারিখে বন্দর থানায় দায়ের হওয়া ১৪ নম্বর মামলায় নূর উদ্দিন ও তাঁর চালক বিপ্লবকে আসামী করে মামলা সাজানো হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয় চোরাই ও অবৈধ মালামাল জব্দের কথা, যার সাথে তাঁর কোনো ধরনের দূরতম সম্পৃক্ততাও ছিল না। সম্ভাব্য হয়রানির বিষয়টি আঁচ করতে পেরে এর আগেই থানায় জিডি ও অভিযোগ করা সত্ত্বেও পুলিশি প্রভাব ব্যবহার করে তাঁকে চুরির মামলায় জড়ানো হয়।

 অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মামলাটির বাদী মোহাম্মদ জামাল হোসেন মূলত এসআই ইয়াছিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং অনুগত এক সহযোগী। নির্ভরযোগ্য তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, জামাল হোসেন কোনো সৎ ব্যবসায়ী নন, বরং তিনি নিজে একজন চিহ্নিত চোর ও সাজাপ্রাপ্ত দাগি আসামি। বন্দর থানার এফআইআর নম্বর-১২ (তারিখ: ১৮ মার্চ ২০২৪)-এর নথিপত্রে প্রমাণ পাওয়া যায়, দণ্ডবিধির ৪০৭ ও ১০৯ ধারায় একটি চোরাচালান মামলায় জামাল হোসেনকে পূর্বে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। সেখানে অভিযোগ ছিল, বিদেশে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা গার্মেন্টস পণ্য কাভার্ডভ্যান থেকে আত্মসাৎ করে তা চোরারাজারে বিক্রি করা। ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চার্জশিট দেওয়া হয়। এসআই ইয়াছিন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এমন এক চিহ্নিত চোরাকারবারিকে ‘ব্যবসায়ী’ বানিয়ে বাদী হিসেবে ব্যবহার করে নূর উদ্দিনকে সাজানো মামলায় ফাঁসিয়েছেন বলে প্রমাণ মিলেছে।

 অর্থ লেনদেনের সপক্ষে সময়ের প্রয়াস-এর প্রতিবেদকের হাতে আসা অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ে জালিয়াতির একাধিক প্রমাণ উঠে এসেছে। একটি ৪৯ সেকেন্ডের অডিও রেকর্ডে স্পষ্টভাবে এসআই ইয়াছিনের গলায় বলতে শোনা যায়, “ভাইয়েরে দিতে হয়বো তো। সেদিনই তো কইলাম ভাইয়ের দরকার বেশি।” উত্তরে ব্যবসায়ী নূর উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বলছি তো।” কথোপকথনের শেষ দিকে ৫০ হাজার টাকা হস্তান্তরের বিষয়টি উঠে আসে এবং ইয়াছিন আশ্বস্ত করেন, “ভাই, ওয়াদা করছি, কাজ করে দেওয়া।” এ ছাড়া অন্য একটি ভিডিও ক্লিপে সরাসরি পুলিশ কর্মকর্তার হাতে টাকা দেওয়ার দৃশ্য এবং টাকা লেনদেনের সময় কাজ করে দেওয়ার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রেকর্ড রয়েছে।

 কেবল মামলা দেওয়াতেই ক্ষান্ত হননি চক্রটি, মামলাটি মীমাংসা বা তুলে নেওয়ার নাম করেও নূর উদ্দিনের থেকে পুনরায় কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। বাদী জামাল হোসেনের সঙ্গে নূর উদ্দিনের অডিও কথোপকথনে জামালকে স্বীকার করতে শোনা যায়, তিনি ইতিমধ্যেই ২ লাখ টাকা বুঝে পেয়েছেন। তবে মামলা প্রত্যাহার বা আপসের পূর্বশর্ত হিসেবে জামাল দাবি করেন, এসআই ইয়াছিনের বিরুদ্ধে সিএমপি কার্যালয়ে যে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, তা আগে তুলে নিতে হবে। ভুক্তভোগী নূর উদ্দিন জানান, মিথ্যা মামলা দিয়ে শুধু অর্থই আত্মসাৎ করা হয়নি, দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্মান ও ব্যবসায়ের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।

 এসব বিস্ফোরক অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে এসআই মো. ইয়াছিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে ঘোরানোর চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, নূর উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় বন্দর থানা সূত্রে এবং মূলত গাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত একটি হিসাবের বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে আর্থিক বকেয়া ছিল। ইয়াছিন বলেন, তিনি বা তাঁর ভাই গাড়ি ভাড়া দিতেন এবং সেই ভাড়ার বকেয়া টাকা পরিশোধের সময় হয়তো নূর উদ্দিন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিও করে রেখেছিলেন।

 অন্যদিকে, নগর পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পুলিশের অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) নগরীর দামপাড়ায় সিএমপির ‘ওপেন হাউজ ডে’ কর্মসূচিতে বক্তব্য প্রদানকালে পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্পষ্ট বার্তা দেন। তিনি জানান, নগরবাসীর যেকোনো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক সমাধান করা হবে। পুলিশের যেকোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম, দুর্নীতি বা চাঁদাবাজির সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না এবং কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেবাপ্রত্যাশীদের ওপর কোনো প্রকার হয়রানি মেনে নেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।


জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত