ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও এক ঘণ্টা, কোথাও তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে দিনে ফ্যান-এসি চালাতে না পেরে গরমে কষ্টের পাশাপাশি রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে মানুষের। বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামনের কয়েক সপ্তাহে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকলেও গ্যাসের সংকটে বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। আবার জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুরে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৪২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৯০৪ মেগাওয়াট। বিকেলে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২০১ মেগাওয়াটে। এর আগে ২৫ আগস্ট রাত আটটায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তখন ১ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। সন্ধ্যা ছয়টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ২৯৫ মেগাওয়াট।
গরম বাড়লেই বাড়ে বিদ্যুতের চাপ : দেশে শীত ও গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। শীতকালে সাধারণত বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ৯ থেকে ১১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। দিনের বেলায় চাহিদা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও রাতে তা বেড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছায়। গরমের সময় চিত্রটি পুরোপুরি বদলে যায়। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। এ সময় চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কোনও কোনও দিন চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জুলাই ও আগস্টে বৃষ্টি হলে কোনো কোনো দিন তাপমাত্রা কিছুটা কমে। তখন বিদ্যুতের চাহিদাও কমে আসে। কিন্তু তাপমাত্রা বেড়ে চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে উঠলে সরবরাহ ঠিক রাখতে লোডশেডিং ছাড়া বিকল্প থাকে না। সাধারণত অক্টোবর থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের পর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে এ সময়ে লোডশেডিংয়ের চাপও কমে।
গ্যাসের অভাবে বসে আছে বিদ্যুৎকেন্দ্র : বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংকটের সঙ্গে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতিও সরাসরি যুক্ত। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে গ্যাসভিত্তিক ৭২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৪১টি কেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না। এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৮৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৭২ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে ঘাটতি পূরণে অন্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তেলভিত্তিক কেন্দ্রেও পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন নেই : দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। সংকটের সময়ে এসব কেন্দ্র থেকে আগে চার থেকে সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। এবার সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তাও এতে প্রভাব ফেলছে। ফলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চাহিদা সামাল দিতে সরকার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থাও করছে। এরই মধ্যে রোববার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়াতে ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ালেই যে সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘাটতি পূরণ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ গ্যাসের সংকট, তেল সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা—সবকিছু মিলিয়েই সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতি নির্ধারিত হচ্ছে।
দিনে গরম, রাতে ঘুমের ব্যাঘাত : লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনে ও রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে বাসাবাড়িতে ফ্যান, এসি ও পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় রান্না, পড়াশোনা, কাপড় ধোয়া এবং অনলাইন কাজেও ব্যাঘাত ঘটছে। বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা পলি বেগম বলেন, দিনের বেলায় গরমের মধ্যে ফ্যান চালানো যায় না। রাতে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো ঘুমানোও সম্ভব হচ্ছে না। সকালে কাজের সময় শরীর খারাপ লাগে। মধুবাগের বাসিন্দা আসাদ হোসেন বলেন, সারা দিন অফিস করার পর বাসায় ফিরে বিশ্রামের সুযোগও থাকছে না। সন্ধ্যার পর কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। রাতে লোডশেডিং হলে ঘুম নষ্ট হয়, অথচ সকালে আবার কাজে যেতে হয়। পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা সবিতা চক্রবর্তী বলেন, সন্ধ্যার পর কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যায়। গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে শিশু ও বয়স্কদের। মিরপুরের বাসিন্দা মেঘলা আক্তার বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে রান্না থেকে শুরু করে পানি তোলা—সবকিছুতেই সমস্যা হয়। বিদ্যুৎচালিত চুলা থাকলেও লোডশেডিংয়ের সময় সেটি কোনো কাজে আসে না।
লোডশেডিংয়ের সঙ্গে বাড়ছে বাড়তি খরচ : বিদ্যুতের ঘাটতির প্রভাব শুধু ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাড়ছে মানুষের বাড়তি ব্যয়ও। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানির খরচ বাড়ছে। শান্তিনগরের দোকানি মোস্তফা আলী বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে দোকানে বসে থাকা কঠিন হয়ে যায়। জেনারেটর চালাতে গেলে ডিজেলের খরচ আছে। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ বিল, অন্যদিকে জেনারেটরের জ্বালানি—দুই ধরনের খরচই বাড়ছে। বিশেষ করে রেস্তোরাঁ, দোকান, ছোট কারখানা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আপাতত লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিদ্যুতের চাহিদা না কমা পর্যন্ত সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান পুরোপুরি দূর করা কঠিন। তাঁর মতে, গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির কারণে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি ডি রহমত উল্লাহ বলেন, জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো গেলে লোডশেডিং কমানো সম্ভব। কিন্তু গরমের কারণে চাহিদা যে হারে বাড়ছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে কমানোর সুযোগ নেই। অতিরিক্ত জ্বালানি এনে উৎপাদন বাড়াতেও সময় লাগে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরেও ভ্যাপসা গরম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় তাপমাত্রার তুলনায় গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তবে অক্টোবরের আগে গরম থেকে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ বিদ্যুতের সংকট থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গরম কমার অপেক্ষাও করতে হবে। এর মধ্যে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের উন্নতি না হলে লোডশেডিংয়ের চাপ পুরোপুরি কাটবে না।

শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও এক ঘণ্টা, কোথাও তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে দিনে ফ্যান-এসি চালাতে না পেরে গরমে কষ্টের পাশাপাশি রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে মানুষের। বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামনের কয়েক সপ্তাহে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকলেও গ্যাসের সংকটে বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। আবার জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুরে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৪২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৯০৪ মেগাওয়াট। বিকেলে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২০১ মেগাওয়াটে। এর আগে ২৫ আগস্ট রাত আটটায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তখন ১ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। সন্ধ্যা ছয়টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ২৯৫ মেগাওয়াট।
গরম বাড়লেই বাড়ে বিদ্যুতের চাপ : দেশে শীত ও গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। শীতকালে সাধারণত বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ৯ থেকে ১১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। দিনের বেলায় চাহিদা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও রাতে তা বেড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছায়। গরমের সময় চিত্রটি পুরোপুরি বদলে যায়। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। এ সময় চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কোনও কোনও দিন চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জুলাই ও আগস্টে বৃষ্টি হলে কোনো কোনো দিন তাপমাত্রা কিছুটা কমে। তখন বিদ্যুতের চাহিদাও কমে আসে। কিন্তু তাপমাত্রা বেড়ে চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে উঠলে সরবরাহ ঠিক রাখতে লোডশেডিং ছাড়া বিকল্প থাকে না। সাধারণত অক্টোবর থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের পর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে এ সময়ে লোডশেডিংয়ের চাপও কমে।
গ্যাসের অভাবে বসে আছে বিদ্যুৎকেন্দ্র : বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংকটের সঙ্গে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতিও সরাসরি যুক্ত। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে গ্যাসভিত্তিক ৭২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৪১টি কেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না। এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৮৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৭২ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে ঘাটতি পূরণে অন্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তেলভিত্তিক কেন্দ্রেও পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন নেই : দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। সংকটের সময়ে এসব কেন্দ্র থেকে আগে চার থেকে সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। এবার সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তাও এতে প্রভাব ফেলছে। ফলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চাহিদা সামাল দিতে সরকার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থাও করছে। এরই মধ্যে রোববার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়াতে ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ালেই যে সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘাটতি পূরণ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ গ্যাসের সংকট, তেল সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা—সবকিছু মিলিয়েই সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতি নির্ধারিত হচ্ছে।
দিনে গরম, রাতে ঘুমের ব্যাঘাত : লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনে ও রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে বাসাবাড়িতে ফ্যান, এসি ও পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় রান্না, পড়াশোনা, কাপড় ধোয়া এবং অনলাইন কাজেও ব্যাঘাত ঘটছে। বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা পলি বেগম বলেন, দিনের বেলায় গরমের মধ্যে ফ্যান চালানো যায় না। রাতে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো ঘুমানোও সম্ভব হচ্ছে না। সকালে কাজের সময় শরীর খারাপ লাগে। মধুবাগের বাসিন্দা আসাদ হোসেন বলেন, সারা দিন অফিস করার পর বাসায় ফিরে বিশ্রামের সুযোগও থাকছে না। সন্ধ্যার পর কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। রাতে লোডশেডিং হলে ঘুম নষ্ট হয়, অথচ সকালে আবার কাজে যেতে হয়। পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা সবিতা চক্রবর্তী বলেন, সন্ধ্যার পর কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যায়। গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে শিশু ও বয়স্কদের। মিরপুরের বাসিন্দা মেঘলা আক্তার বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে রান্না থেকে শুরু করে পানি তোলা—সবকিছুতেই সমস্যা হয়। বিদ্যুৎচালিত চুলা থাকলেও লোডশেডিংয়ের সময় সেটি কোনো কাজে আসে না।
লোডশেডিংয়ের সঙ্গে বাড়ছে বাড়তি খরচ : বিদ্যুতের ঘাটতির প্রভাব শুধু ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাড়ছে মানুষের বাড়তি ব্যয়ও। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানির খরচ বাড়ছে। শান্তিনগরের দোকানি মোস্তফা আলী বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে দোকানে বসে থাকা কঠিন হয়ে যায়। জেনারেটর চালাতে গেলে ডিজেলের খরচ আছে। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ বিল, অন্যদিকে জেনারেটরের জ্বালানি—দুই ধরনের খরচই বাড়ছে। বিশেষ করে রেস্তোরাঁ, দোকান, ছোট কারখানা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আপাতত লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিদ্যুতের চাহিদা না কমা পর্যন্ত সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান পুরোপুরি দূর করা কঠিন। তাঁর মতে, গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির কারণে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি ডি রহমত উল্লাহ বলেন, জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো গেলে লোডশেডিং কমানো সম্ভব। কিন্তু গরমের কারণে চাহিদা যে হারে বাড়ছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে কমানোর সুযোগ নেই। অতিরিক্ত জ্বালানি এনে উৎপাদন বাড়াতেও সময় লাগে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরেও ভ্যাপসা গরম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় তাপমাত্রার তুলনায় গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তবে অক্টোবরের আগে গরম থেকে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ বিদ্যুতের সংকট থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গরম কমার অপেক্ষাও করতে হবে। এর মধ্যে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের উন্নতি না হলে লোডশেডিংয়ের চাপ পুরোপুরি কাটবে না।

আপনার মতামত লিখুন