জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

কোটি টাকার ডলু-লুট ও নিশুতি রাতের নামজারি-বাণিজ্য

সাতকানিয়ার বিদায়ি ইউএনও মাহমুদুল হাসানের শেষ ছোবল!


গাজী গোফরান
গাজী গোফরান
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

সাতকানিয়ার বিদায়ি ইউএনও মাহমুদুল হাসানের শেষ ছোবল!

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় এক বিদায়ি আমলার প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বিনষ্ট, আইনকানুন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একক ক্ষমতার মহড়া এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংবেদনশীল চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ৩৬তম ব্যাচের বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের বদলির অফিশিয়াল নির্দেশ জারির পর পরই একের পর এক অনিয়ম ও নীতিবহির্ভূত সিদ্ধান্তের থলে খুলে যেতে শুরু করেছে। 

এই ঘটনায় শুধু স্থানীয় পর্যায়েই নয়, পুরো চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনিক অঙ্গনে চরম বিস্ময় ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। বদলি আদেশের মাত্র চার দিনের মাথায় এক কলমের খোঁচায় দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই ১ কোটি ৮৩ লাখ ঘনফুটেরও বেশি বালু-মাটি অপসারণের মোড়কে ঐতিহ্যবাহী ডলু খাল একটি প্রভাবশালী চক্রের হাতে সঁপে দেওয়া এবং সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলানোর শেষ ৪৮ ঘণ্টায় নিজ বাসভবনে নিশুতি রাতে তিন শতাধিক নামজারি মামলা নিষ্পত্তির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। 

এসব প্রশাসনিক দুর্নীতির পাশাপাশি সরকারি বাসভবনে নৈতিক স্খলনের ভয়াবহ অভিযোগ এখন জনপরিসরে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনিয়মের গভীরতা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে সমন্বিত উচ্চপর্যায়ের তদন্তে নেমেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং ছায়া তদন্ত শুরু করেছে রাষ্ট্রের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।

সাতকানিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক ৫৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ডলু নদীর একটি বড় অংশ এখন বিদায়ি আমলার বেআইনি সিদ্ধান্তের বলি হতে চলেছে। নদীটি বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপত্তি লাভ করে লোহাগাড়ার চুনতি, নারিশ্চা, পানত্রিশা, পুটিবিলা, আধুনগর অতিক্রম করে সাতকানিয়ার গারাংগিয়া, সোনাকানিয়া, রূপকানিয়া, সদর, পৌরসভা, রামপুর, পশ্চিম ঢেমশা, গাঠিয়াডেঙ্গা, নলুয়া ও আমিলাইশ ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিখ্যাত সাঙ্গু নদীতে মিশেছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা, খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে ঢাকা বিভাগে ন্যস্ত করে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে প্রশাসনিক নীতি ও সৌজন্যের ধার না ধারে বদলির আদেশের চার দিন অতিবাহিত হওয়ার পর, গত ২৭ আগস্ট তিনি একটি বিতর্কিত আদেশে সই করেন। প্রজ্ঞাপনটিতে সাতকানিয়ার গারাঙ্গিয়া সেতু সংলগ্ন পয়েন্ট থেকে উত্তরের নলুয়া-আমিলাইশ তিন খালের মিলনস্থল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ২৪ কিলোমিটার এলাকায় জেগে ওঠা ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ ঘনফুট বালু ও মাটির ঢিবি ‘স্বেচ্ছাশ্রমে’ সরানোর নামে ‘মেসার্স করিম অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি সংস্থাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

আইন অনুযায়ী যেকোনো সরকারি প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বা অপসারণের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান করা বাধ্যতামূলক। অথচ উক্ত খনিজ সম্পদের অগণিত কোটি টাকার বাজারমূল্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কোনো নিয়ম ছাড়াই পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়। এই বিতর্কিত প্রশাসনিক আদেশের বদৌলতে বিশাল ডলু খালের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত চলে গেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দখলে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কার্যাদেশ হাতিয়ে নেওয়ার পরপরই খালের প্রতি আধা কিলোমিটার এলাকা ৫০ লাখ টাকা দর বেঁধে দিয়ে স্থানীয় অপরাধী চক্র ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে বালু-মাটি ইজারা দেওয়ার গোপন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুরো নদী অববাহিকায় এখন অবৈধভাবে বালু ও মাটি কাটার মহোৎসব চলছে, যা কেন্দ্র করে এলাকাভিত্তিক ক্যাডার বাহিনীর মধ্যে এলাকা দখলের কোন্দল ও তীব্র সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের এই খামখেয়ালি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কার্যাদেশের ফলে ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকারি কোষাগার। উক্ত খালের আওতাধীন অঞ্চলে সরকারের নিবন্ধিত ও আইনিভাবে স্বীকৃত ৮টি বালুমহাল অবস্থিত, সোনাকানিয়া, রূপকানিয়া, সাতকানিয়া সদর, রামপুর, পশ্চিম ঢেমশা, রোজমর পাড়া, গাঠিয়াডেঙ্গা এবং নলুয়া-আমিলাইশ। প্রতি বছর এসব বালুমহাল নিয়মিত ইজারা দিয়ে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পেত। তবে ‘স্বেচ্ছাশ্রমের’ চাদরে পুরো খালের মাটি ও বালু বিনামূল্যে তুলে নিয়ে বিক্রির অনুমতি দেওয়ায় ইজারাকৃত এই বৈধ ৮টি বালুমহালের অস্তিত্বই এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। ফলস্বরূপ, সরকার কোটি কোটি টাকার নির্ধারিত রাজস্ব আয় থেকে সরাসরি বঞ্চিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে নিশ্চিত করেছেন, ইউএনও কার্যালয়ের নির্দেশনায় ড্রোন ও টোটাল স্টেশন যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাথমিক পরিমাপ করে ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ ঘনফুট অপসারণযোগ্য মাটির একটি কারিগরি হিসাব জমা দিয়েছিলেন তাঁরা। তবে সেই হিসাবকে ঢাল বানিয়ে উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়া কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সুনির্দিষ্ট হাইড্রোলজিক্যাল ও কারিগরি পর্যবেক্ষণ ব্যতীত কার্যাদেশ জারি করা একেবারেই নিয়মবহির্ভূত।

পাউবো এবং পরিবেশ গবেষকদের সতর্কবার্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নদীর তলদেশ ও তীরবর্তী অঞ্চল থেকে এমন অবৈজ্ঞানিক উপায়ে বালু-মাটি উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে চিরতরে বিকল করে দেবে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর প্রাকৃতিক মেজাজ ও ভৌগোলিক বিন্যাস বিবেচনা না করে যত্রতত্র মাটি কাটলে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্মিত নদী রক্ষা বাঁধ, সিসি ব্লক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা ধসে পড়বে।

খালের ওপর নির্মিত সেতু, কালভার্ট ও সংযোগ কাঠামোর মূল স্তম্ভ (পিয়ার) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে যেতে পারে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নদীর উভয় কূলের ভাঙন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে পুরো সাতকানিয়া ও প্রতিবেশী লোহাগাড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ লোকালয় ভয়াবহ বন্যা ও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে।

পাউবোর সুস্পষ্ট লিখিত অভিমত ছাড়া একজন ইউএনও কর্তৃক নিজ এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এত বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্তরালে অগণিত কোটি টাকার গোপন আর্থিক লেনদেন রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

ডলু নদীর সর্বনাশের পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও চরম বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন বিদায়ি এই কর্মকর্তা। সাতকানিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) গত ১৬ আগস্ট বদলি হওয়ার পর ২৫ আগস্ট ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে উক্ত পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর মাত্র দুই দিন, ২৬ ও ২৭ আগস্ট তিনি কাজের সুযোগ পান, কারণ ২৭ আগস্টই ছিল সাতকানিয়ায় তাঁর শেষ কর্মদিবস।

অভিযোগ উঠেছে, এই স্বল্প ব্যবধানের পূর্ণ সুযোগ নিয়ে তিনি সরকারি চাকরির বিধিমালার তোয়াক্কা না করে নিজস্ব সরকারি বাংলোতে বসে নিশুতি রাতে দীর্ঘদিনের স্থগিত ও বিতর্কিত তিন শতাধিক নামজারি (মিউটেশন) আবেদন অনুমোদন করেন।

প্রচলিত ভূমি আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, একটি নামজারি ফাইল নিষ্পত্তিতে সরেজমিন তদন্ত, মূল দলিল যাচাই, পাট্টা পরীক্ষা, ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার (তহশিলদার) প্রতিবেদন এবং আবেদনকারীর উপস্থিতিতে গণশুনানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে মাত্র দুই দিনের মধ্যে কীভাবে এতগুলো বিতর্কিত ফাইলের সব আইনি বাধ্যবাধকতা শেষ হলো, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্বয়ং ভূমি অফিসের কর্মীরা।

সাতকানিয়া সদর ভূমি দপ্তরের তহশিলদার কাজী ইমরুল কায়েস নিশ্চিত করেন যে, ওই দুই দিনে তাঁর কার্যালয়েরই ৬০ থেকে ৭০টি ফাইল তড়িঘড়ি সই করা হয়। অপরদিকে বাজালিয়া ভূমি দপ্তরের তহশিলদার মোকাম্মেল হোসেন তাঁর দপ্তরের প্রায় ৩০টি ফাইল অনুমোদনের সত্যতা জানান। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো প্রকার নথিপত্র যাচাই ছাড়াই মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে গভীর রাতে সরকারি বাসভবনে বসে এসব ফাইলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদি নামজারিগুলোতে কোনো আইনগত ত্রুটি বা জটিলতা না-ই থাকত, তবে পূর্ববর্তী সময়গুলোতে কেন সেগুলো আটকে রাখা হয়েছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

বদলি আদেশের শেষ মুহূর্তে সাবেক ইউএনওর এমন বেপরোয়া আচরণ ও প্রশাসনিক অপকর্মের চিত্র প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম হিসেবে গণ্য করে তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের স্টাফ অফিসার মো. আসিফ জাহান শিকদার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার গভীরতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার স্বার্থে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকতকে পুরো অনিয়ম খতিয়ে দেখতে সুনির্দিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটি গত ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সাতকানিয়া ভূমি দপ্তরের ডিজিটাল সিস্টেম লগ (Digital Audit Trail) সূক্ষ্মভাবে নিরীক্ষা করছে। ডিজিটাল রেকর্ড থেকেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে, কোন ইউজার আইডি ব্যবহার করে ঠিক কখন, কত দ্রুত এবং কী প্রক্রিয়ায় মিউটেশন ফাইলগুলোতে প্রবেশ করে সই করা হয়েছে।

একই সঙ্গে, অনিয়মের ভয়াবহতা অনুধাবন করে রাষ্ট্রের একাধিক স্বনামধন্য গোয়েন্দা সংস্থা ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। বিদায়ি ইউএনওর শেষ কর্মদিবসের রাতে সরকারি বাসভবনে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল বা সুবিধাবাদী চক্র প্রবেশ করেছিল কিনা এবং সেখানে সরাসরি কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কিনা, তা সুনিশ্চিত করতে বাংলো ও তার আশপাশের সব সিসিটিভি ফুটেজ এবং সিকিউরিটি লগের ডেটা সংগ্রহ করছে গোয়েন্দারা।

সাতকানিয়া এলাকায় একশটিরও বেশি লাইসেন্সবিহীন বেআইনি ইটভাটা পরিচালনা, পাহাড় সাবাড় করা এবং আবাদি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (টপসয়েল) কাটার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের মতে, খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের আমলে এসব পরিবেশবিধ্বংসী অপকর্মের বিরুদ্ধে যেসব প্রশাসনিক অভিযান চালানো হতো, তার সবই ছিল নেহাত ‘লোকদেখানো তামাশা’।

অভিযোগ রয়েছে, একটি পুরো ইউনিয়নের ভেতর অবৈধ মাটি কাটার ফলে স্থানীয় নদীর প্রাকৃতিক পরিকাঠামো ও স্বাভাবিক রূপ বিনষ্ট হলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি সাবেক এই কর্মকর্তা। উপরন্তু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করা এবং স্থানীয় সংবাদকর্মীদের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও সম্মানহানিকর আচরণ করার বহু অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সচেতন মহলে জোরালো আলোচনা রয়েছে, উক্ত কর্মকর্তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচিতির ভয় দেখাতেন। তাঁর নিজ বাড়ি ফেনী জেলার সদর উপজেলার ৭নং ওয়ার্ডের বারাহিপুরে। 

২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিসিএস ক্যাডারে যোগ দেওয়া এই সিনিয়র সহকারী সচিবের সহধর্মিণী চট্টগ্রাম বাকলিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষক, যার পৈতৃক নিবাস বগুড়ায়। শ্বশুরবাড়ির কথিত রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবারের সদস্যের অতীতে ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার দাপট দেখিয়ে তিনি স্থানীয় প্রশাসনে একক রাজত্ব চালিয়েছেন এবং অজস্র অনিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন বলে জানা গেছে।

প্রশাসনিক দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার গণ্ডি পেরিয়ে এই কর্মকর্তার ব্যক্তিসত্তা ও চরিত্র নিয়ে চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি বাসভবন ব্যবহারের শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের পাশাপাশি গুরুতর নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা এখন সাতকানিয়ার আলোচনার প্রধান অনুষঙ্গ।

সম্প্রতি তাঁর সরকারি বাসভবনে (বাংলো) দীর্ঘ দিন কর্মরত এক বিধবা গৃহকর্মী চার মাসের গর্ভবতী হয়ে পড়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। এই অনৈতিক ঘটনার বিষয়ে বেশ কিছু অডিও এবং ভিডিও রেকর্ড সামাজিক ও স্থানীয় জনপরিসরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকারি বাংলোর মতো স্পর্শকাতর ও প্রশাসনিক স্থানে এমন নৈতিক স্খলন ও শ্লীলতাহানির ঘটনা স্থানীয় প্রশাসনে চরম লজ্জা ও নজিরবিহীন ভাবমূর্তি সংকটের সৃষ্টি করেছে।

সার্বিক অনিয়মের ব্যাপারে ডলু খালের কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স করিম অ্যান্ড ব্রাদার্স’-এর মালিক আবদুল করিমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, “আমাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শতভাগ আইনি নিয়ম মেনেই স্বেচ্ছাশ্রমে নদী খননের অনুমতি পেয়েছে। আমরা কারও কাছে মাটি বা বালু বিক্রি করছি না; প্রশাসনিক নির্দেশনা মেনে কেবল পলি ও মাটি সরানোর কাজ সম্পন্ন করছি।”

অন্যদিকে, সব অভিযোগ একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করে বিদায়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান দাবি করেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগই মনগড়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রশাসনিক সব বিধিবিধান অনুসরণ করেই ডলু খালের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া মেনেই নামজারি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ ছিল না।”

তবে সাবেক ইউএনওর এই সাফাই দাবিকে পুরোপুরি মিথ্যা আখ্যা দিয়ে সাতকানিয়ার সাধারণ জনগণ ও সচেতন সুশীল সমাজ অবিলম্বে ডলু খালের বেআইনি কার্যাদেশ বাতিল, গভীর রাতে অনুমোদিত নামজারিগুলোর স্বচ্ছ পুনঃতদন্ত এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক স্খলনের দায়ে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সাতকানিয়ার বিদায়ি ইউএনও মাহমুদুল হাসানের শেষ ছোবল!

প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় এক বিদায়ি আমলার প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বিনষ্ট, আইনকানুন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একক ক্ষমতার মহড়া এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংবেদনশীল চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ৩৬তম ব্যাচের বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের বদলির অফিশিয়াল নির্দেশ জারির পর পরই একের পর এক অনিয়ম ও নীতিবহির্ভূত সিদ্ধান্তের থলে খুলে যেতে শুরু করেছে। 

এই ঘটনায় শুধু স্থানীয় পর্যায়েই নয়, পুরো চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনিক অঙ্গনে চরম বিস্ময় ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। বদলি আদেশের মাত্র চার দিনের মাথায় এক কলমের খোঁচায় দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই ১ কোটি ৮৩ লাখ ঘনফুটেরও বেশি বালু-মাটি অপসারণের মোড়কে ঐতিহ্যবাহী ডলু খাল একটি প্রভাবশালী চক্রের হাতে সঁপে দেওয়া এবং সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলানোর শেষ ৪৮ ঘণ্টায় নিজ বাসভবনে নিশুতি রাতে তিন শতাধিক নামজারি মামলা নিষ্পত্তির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। 

এসব প্রশাসনিক দুর্নীতির পাশাপাশি সরকারি বাসভবনে নৈতিক স্খলনের ভয়াবহ অভিযোগ এখন জনপরিসরে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনিয়মের গভীরতা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে সমন্বিত উচ্চপর্যায়ের তদন্তে নেমেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং ছায়া তদন্ত শুরু করেছে রাষ্ট্রের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।

সাতকানিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক ৫৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ডলু নদীর একটি বড় অংশ এখন বিদায়ি আমলার বেআইনি সিদ্ধান্তের বলি হতে চলেছে। নদীটি বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপত্তি লাভ করে লোহাগাড়ার চুনতি, নারিশ্চা, পানত্রিশা, পুটিবিলা, আধুনগর অতিক্রম করে সাতকানিয়ার গারাংগিয়া, সোনাকানিয়া, রূপকানিয়া, সদর, পৌরসভা, রামপুর, পশ্চিম ঢেমশা, গাঠিয়াডেঙ্গা, নলুয়া ও আমিলাইশ ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিখ্যাত সাঙ্গু নদীতে মিশেছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা, খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে ঢাকা বিভাগে ন্যস্ত করে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে প্রশাসনিক নীতি ও সৌজন্যের ধার না ধারে বদলির আদেশের চার দিন অতিবাহিত হওয়ার পর, গত ২৭ আগস্ট তিনি একটি বিতর্কিত আদেশে সই করেন। প্রজ্ঞাপনটিতে সাতকানিয়ার গারাঙ্গিয়া সেতু সংলগ্ন পয়েন্ট থেকে উত্তরের নলুয়া-আমিলাইশ তিন খালের মিলনস্থল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ২৪ কিলোমিটার এলাকায় জেগে ওঠা ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ ঘনফুট বালু ও মাটির ঢিবি ‘স্বেচ্ছাশ্রমে’ সরানোর নামে ‘মেসার্স করিম অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি সংস্থাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

আইন অনুযায়ী যেকোনো সরকারি প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বা অপসারণের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান করা বাধ্যতামূলক। অথচ উক্ত খনিজ সম্পদের অগণিত কোটি টাকার বাজারমূল্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কোনো নিয়ম ছাড়াই পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়। এই বিতর্কিত প্রশাসনিক আদেশের বদৌলতে বিশাল ডলু খালের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত চলে গেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দখলে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কার্যাদেশ হাতিয়ে নেওয়ার পরপরই খালের প্রতি আধা কিলোমিটার এলাকা ৫০ লাখ টাকা দর বেঁধে দিয়ে স্থানীয় অপরাধী চক্র ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে বালু-মাটি ইজারা দেওয়ার গোপন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুরো নদী অববাহিকায় এখন অবৈধভাবে বালু ও মাটি কাটার মহোৎসব চলছে, যা কেন্দ্র করে এলাকাভিত্তিক ক্যাডার বাহিনীর মধ্যে এলাকা দখলের কোন্দল ও তীব্র সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের এই খামখেয়ালি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কার্যাদেশের ফলে ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকারি কোষাগার। উক্ত খালের আওতাধীন অঞ্চলে সরকারের নিবন্ধিত ও আইনিভাবে স্বীকৃত ৮টি বালুমহাল অবস্থিত, সোনাকানিয়া, রূপকানিয়া, সাতকানিয়া সদর, রামপুর, পশ্চিম ঢেমশা, রোজমর পাড়া, গাঠিয়াডেঙ্গা এবং নলুয়া-আমিলাইশ। প্রতি বছর এসব বালুমহাল নিয়মিত ইজারা দিয়ে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পেত। তবে ‘স্বেচ্ছাশ্রমের’ চাদরে পুরো খালের মাটি ও বালু বিনামূল্যে তুলে নিয়ে বিক্রির অনুমতি দেওয়ায় ইজারাকৃত এই বৈধ ৮টি বালুমহালের অস্তিত্বই এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। ফলস্বরূপ, সরকার কোটি কোটি টাকার নির্ধারিত রাজস্ব আয় থেকে সরাসরি বঞ্চিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে নিশ্চিত করেছেন, ইউএনও কার্যালয়ের নির্দেশনায় ড্রোন ও টোটাল স্টেশন যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাথমিক পরিমাপ করে ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ ঘনফুট অপসারণযোগ্য মাটির একটি কারিগরি হিসাব জমা দিয়েছিলেন তাঁরা। তবে সেই হিসাবকে ঢাল বানিয়ে উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়া কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সুনির্দিষ্ট হাইড্রোলজিক্যাল ও কারিগরি পর্যবেক্ষণ ব্যতীত কার্যাদেশ জারি করা একেবারেই নিয়মবহির্ভূত।

পাউবো এবং পরিবেশ গবেষকদের সতর্কবার্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নদীর তলদেশ ও তীরবর্তী অঞ্চল থেকে এমন অবৈজ্ঞানিক উপায়ে বালু-মাটি উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে চিরতরে বিকল করে দেবে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর প্রাকৃতিক মেজাজ ও ভৌগোলিক বিন্যাস বিবেচনা না করে যত্রতত্র মাটি কাটলে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্মিত নদী রক্ষা বাঁধ, সিসি ব্লক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা ধসে পড়বে।

খালের ওপর নির্মিত সেতু, কালভার্ট ও সংযোগ কাঠামোর মূল স্তম্ভ (পিয়ার) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে যেতে পারে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নদীর উভয় কূলের ভাঙন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে পুরো সাতকানিয়া ও প্রতিবেশী লোহাগাড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ লোকালয় ভয়াবহ বন্যা ও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে।

পাউবোর সুস্পষ্ট লিখিত অভিমত ছাড়া একজন ইউএনও কর্তৃক নিজ এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এত বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্তরালে অগণিত কোটি টাকার গোপন আর্থিক লেনদেন রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

ডলু নদীর সর্বনাশের পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও চরম বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন বিদায়ি এই কর্মকর্তা। সাতকানিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) গত ১৬ আগস্ট বদলি হওয়ার পর ২৫ আগস্ট ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে উক্ত পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর মাত্র দুই দিন, ২৬ ও ২৭ আগস্ট তিনি কাজের সুযোগ পান, কারণ ২৭ আগস্টই ছিল সাতকানিয়ায় তাঁর শেষ কর্মদিবস।

অভিযোগ উঠেছে, এই স্বল্প ব্যবধানের পূর্ণ সুযোগ নিয়ে তিনি সরকারি চাকরির বিধিমালার তোয়াক্কা না করে নিজস্ব সরকারি বাংলোতে বসে নিশুতি রাতে দীর্ঘদিনের স্থগিত ও বিতর্কিত তিন শতাধিক নামজারি (মিউটেশন) আবেদন অনুমোদন করেন।

প্রচলিত ভূমি আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, একটি নামজারি ফাইল নিষ্পত্তিতে সরেজমিন তদন্ত, মূল দলিল যাচাই, পাট্টা পরীক্ষা, ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার (তহশিলদার) প্রতিবেদন এবং আবেদনকারীর উপস্থিতিতে গণশুনানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে মাত্র দুই দিনের মধ্যে কীভাবে এতগুলো বিতর্কিত ফাইলের সব আইনি বাধ্যবাধকতা শেষ হলো, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্বয়ং ভূমি অফিসের কর্মীরা।

সাতকানিয়া সদর ভূমি দপ্তরের তহশিলদার কাজী ইমরুল কায়েস নিশ্চিত করেন যে, ওই দুই দিনে তাঁর কার্যালয়েরই ৬০ থেকে ৭০টি ফাইল তড়িঘড়ি সই করা হয়। অপরদিকে বাজালিয়া ভূমি দপ্তরের তহশিলদার মোকাম্মেল হোসেন তাঁর দপ্তরের প্রায় ৩০টি ফাইল অনুমোদনের সত্যতা জানান। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো প্রকার নথিপত্র যাচাই ছাড়াই মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে গভীর রাতে সরকারি বাসভবনে বসে এসব ফাইলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদি নামজারিগুলোতে কোনো আইনগত ত্রুটি বা জটিলতা না-ই থাকত, তবে পূর্ববর্তী সময়গুলোতে কেন সেগুলো আটকে রাখা হয়েছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

বদলি আদেশের শেষ মুহূর্তে সাবেক ইউএনওর এমন বেপরোয়া আচরণ ও প্রশাসনিক অপকর্মের চিত্র প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম হিসেবে গণ্য করে তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের স্টাফ অফিসার মো. আসিফ জাহান শিকদার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার গভীরতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার স্বার্থে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকতকে পুরো অনিয়ম খতিয়ে দেখতে সুনির্দিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটি গত ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সাতকানিয়া ভূমি দপ্তরের ডিজিটাল সিস্টেম লগ (Digital Audit Trail) সূক্ষ্মভাবে নিরীক্ষা করছে। ডিজিটাল রেকর্ড থেকেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে, কোন ইউজার আইডি ব্যবহার করে ঠিক কখন, কত দ্রুত এবং কী প্রক্রিয়ায় মিউটেশন ফাইলগুলোতে প্রবেশ করে সই করা হয়েছে।

একই সঙ্গে, অনিয়মের ভয়াবহতা অনুধাবন করে রাষ্ট্রের একাধিক স্বনামধন্য গোয়েন্দা সংস্থা ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। বিদায়ি ইউএনওর শেষ কর্মদিবসের রাতে সরকারি বাসভবনে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল বা সুবিধাবাদী চক্র প্রবেশ করেছিল কিনা এবং সেখানে সরাসরি কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কিনা, তা সুনিশ্চিত করতে বাংলো ও তার আশপাশের সব সিসিটিভি ফুটেজ এবং সিকিউরিটি লগের ডেটা সংগ্রহ করছে গোয়েন্দারা।

সাতকানিয়া এলাকায় একশটিরও বেশি লাইসেন্সবিহীন বেআইনি ইটভাটা পরিচালনা, পাহাড় সাবাড় করা এবং আবাদি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (টপসয়েল) কাটার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের মতে, খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের আমলে এসব পরিবেশবিধ্বংসী অপকর্মের বিরুদ্ধে যেসব প্রশাসনিক অভিযান চালানো হতো, তার সবই ছিল নেহাত ‘লোকদেখানো তামাশা’।

অভিযোগ রয়েছে, একটি পুরো ইউনিয়নের ভেতর অবৈধ মাটি কাটার ফলে স্থানীয় নদীর প্রাকৃতিক পরিকাঠামো ও স্বাভাবিক রূপ বিনষ্ট হলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি সাবেক এই কর্মকর্তা। উপরন্তু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করা এবং স্থানীয় সংবাদকর্মীদের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও সম্মানহানিকর আচরণ করার বহু অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সচেতন মহলে জোরালো আলোচনা রয়েছে, উক্ত কর্মকর্তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচিতির ভয় দেখাতেন। তাঁর নিজ বাড়ি ফেনী জেলার সদর উপজেলার ৭নং ওয়ার্ডের বারাহিপুরে। 

২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিসিএস ক্যাডারে যোগ দেওয়া এই সিনিয়র সহকারী সচিবের সহধর্মিণী চট্টগ্রাম বাকলিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষক, যার পৈতৃক নিবাস বগুড়ায়। শ্বশুরবাড়ির কথিত রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবারের সদস্যের অতীতে ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার দাপট দেখিয়ে তিনি স্থানীয় প্রশাসনে একক রাজত্ব চালিয়েছেন এবং অজস্র অনিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন বলে জানা গেছে।

প্রশাসনিক দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার গণ্ডি পেরিয়ে এই কর্মকর্তার ব্যক্তিসত্তা ও চরিত্র নিয়ে চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি বাসভবন ব্যবহারের শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের পাশাপাশি গুরুতর নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা এখন সাতকানিয়ার আলোচনার প্রধান অনুষঙ্গ।

সম্প্রতি তাঁর সরকারি বাসভবনে (বাংলো) দীর্ঘ দিন কর্মরত এক বিধবা গৃহকর্মী চার মাসের গর্ভবতী হয়ে পড়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। এই অনৈতিক ঘটনার বিষয়ে বেশ কিছু অডিও এবং ভিডিও রেকর্ড সামাজিক ও স্থানীয় জনপরিসরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকারি বাংলোর মতো স্পর্শকাতর ও প্রশাসনিক স্থানে এমন নৈতিক স্খলন ও শ্লীলতাহানির ঘটনা স্থানীয় প্রশাসনে চরম লজ্জা ও নজিরবিহীন ভাবমূর্তি সংকটের সৃষ্টি করেছে।

সার্বিক অনিয়মের ব্যাপারে ডলু খালের কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স করিম অ্যান্ড ব্রাদার্স’-এর মালিক আবদুল করিমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, “আমাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শতভাগ আইনি নিয়ম মেনেই স্বেচ্ছাশ্রমে নদী খননের অনুমতি পেয়েছে। আমরা কারও কাছে মাটি বা বালু বিক্রি করছি না; প্রশাসনিক নির্দেশনা মেনে কেবল পলি ও মাটি সরানোর কাজ সম্পন্ন করছি।”

অন্যদিকে, সব অভিযোগ একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করে বিদায়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান দাবি করেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগই মনগড়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রশাসনিক সব বিধিবিধান অনুসরণ করেই ডলু খালের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া মেনেই নামজারি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ ছিল না।”

তবে সাবেক ইউএনওর এই সাফাই দাবিকে পুরোপুরি মিথ্যা আখ্যা দিয়ে সাতকানিয়ার সাধারণ জনগণ ও সচেতন সুশীল সমাজ অবিলম্বে ডলু খালের বেআইনি কার্যাদেশ বাতিল, গভীর রাতে অনুমোদিত নামজারিগুলোর স্বচ্ছ পুনঃতদন্ত এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক স্খলনের দায়ে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।


জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত