কর্ণফুলী নদীর ওপারে শুধু যে শিল্পায়নের চাকা ঘুরছে তা নয়, এবার সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে যাচ্ছে এক সম্পূর্ণ আধুনিক ও পরিকল্পিত নতুন শহর। উর্বর কৃষিজমিকে নির্বিচারে ধ্বংস না করে, বরং বহুফসলী জমিকে সুরক্ষার বলয়ে রেখেই দক্ষিণ চট্টগ্রামজুড়ে এই নতুন স্যাটেলাইট টাউন গড়ার দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নদীর উত্তর তীরের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ওপর থেকে আবাসন, যানজট এবং ঘনবসতির যে শ্বাসরুদ্ধকর চাপ, তা এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমিয়ে আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান ২০২৫–২০৫০-এর আওতায় প্রণীত ‘আনোয়ারা অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান’-এ বহুল আলোচিত ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ বা এক নগর দুই শহরের বাস্তব রূপরেখা উন্মোচিত করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল চালুর পর থেকেই কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব ঘটে গেছে। টানেল এবং নির্মিত ৬ লেনের সংযোগ সড়ক ধরে এই মেগা পরিকল্পনা বিস্তৃত হচ্ছে বাঁশখালী ও কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত। আনোয়ারার চাতরী, বৈরাগ ও বারখাইন ইউনিয়ন এবং কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান এলাকার প্রায় ৭ হাজার ৩১৫ দশমিক ৫ একর জমি জুড়ে বিশাল এই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়েছে। সিডিএ-র প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস হলেও আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ এই নতুন শহরে বাস করবে ৭ লাখ ২৪ হাজারের বেশি মানুষ। একই সময়ে কর্মসংস্থানের পরিধি বর্তমানের প্রায় সাড় ১৯ হাজার থেকে লাফিয়ে পৌঁছে যাবে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৩৩-এ। চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন, কোরিয়ান ইপিজেড এবং কাফকোর মতো বড় শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পেশাজীবীদের জন্য এই শহরটি হবে এক বিশ্বমানের ঠিকানা।
তবে এই বিশাল নগর গড়ার ক্ষেত্রে চিরাচরিত পরিবেশবিধ্বংসী পদ্ধতির বদলে নেওয়া হয়েছে এক ব্যতিক্রমী টেকসই কৌশল। পরিকল্পনা এলাকার প্রায় ৫৭ শতাংশ জমিই বর্তমানে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। প্রায় ৪ হাজার ১৪৭ একর মোট কৃষিজমির মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৩৮৮ একর জমিকে পুরোপুরি অস্পর্শনীয় রেখে সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সিডিএ সূত্রে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এলাকার কোনো তিন ফসলী বা দুই ফসলী জমির ওপর কোনো সরকারের কোপ পড়বে না। কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখে বাকি প্রায় ২ হাজার ৮৮২ একর বা ৩৯ শতাংশ জমিতে আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক, মিশ্র ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সবুজ এলাকার সমন্বয়ে নগর রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া সরাসরি ভারী শিল্পের জন্য সাড়ে সাত শতাংশ বা ৫০০ একরের কিছু বেশি জমি প্রস্তাবিত থাকলেও শহরের আবাসিক সীমানার ভেতরে কেবল কুটির ও সহায়ক শিল্পের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
দ্রুতগামী নাগরিক জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে নতুন শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আনা হচ্ছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রস্তাব করা হয়েছে মোট ৪৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে যেমন থাকবে ১১ কিলোমিটারের বেশি প্রাইমারি ডিস্ট্রিবিউটর সড়ক, তেমনি থাকবে ২১ কিলোমিটারের বেশি সেকেন্ডারি এবং ১৫ কিলোমিটারের বেশি লোকাল সড়ক। মোট ১৯ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার একদম নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো প্রায় ২৪ কিলোমিটার সড়ক ৪০ থেকে ১২০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করার বড় পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনকে সুগম করতে আনোয়ারা-পটিয়া সড়ককে ১৬০ ফুট পর্যন্ত চওড়া করা হবে এবং আর-১৭০ সড়কটিকে মাতারবাড়ী-চট্টগ্রাম বন্দর সংযোগকারী মূল করিডর হিসেবে শক্তিশালী করা হবে। শিল্পাঞ্চলের ভারী যানবাহনের কারণে যাতে যানজট না হয়, সে জন্য ২৪ দশমিক ৫ একর জায়গাজুড়ে ১ হাজার ট্রাক ধারণক্ষমতার বিশাল ট্রাক টার্মিনাল এবং ৩ দশমিক ২ একর জায়গায় আঞ্চলিক বাস টার্মিনাল গড়ে তোলা হবে। ভবিষ্যতে এর সাথে কমিউটার রেল যোগাযোগের সুযোগও খোলা রাখা হয়েছে।
একটি পূর্ণাঙ্গ মানসম্মত শহরের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত নাগরিক সুবিধার সুনির্দিষ্ট হিসাব নিকাশ রাখা হয়েছে এই মাস্টারপ্ল্যানে। ২০৫০ সালের সম্ভাব্য জনসংখ্যার সেবা নিশ্চিত করতে ৮টি নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, ৯টি ক্লিনিক, একটি ৬ একরের বড় হাসপাতাল এবং ১৮টি আধুনিক কিচেন মার্কেট তৈরি করা হবে। নাগরিকদের মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য ২০ একর জমি খেলার মাঠ এবং ৪০ একর জমি পার্ক ও লেকের জন্য রাখা হয়েছে। কালা বিবির দীঘি, মনু মিয়ার দীঘি ও মুরালী খালের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে মনোরম পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে প্রাকৃতিক নালা ও খালগুলোকে অক্ষত রাখার পাশাপাশি ওয়াসা, বিদ্যুৎ, ফায়ার সার্ভিস ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক জমি বরাদ্দ রাখা নিশ্চিত করা হয়েছে। সিভিল এভিয়েশনের নিয়ম মেনে ভবনের উচ্চতা ও ঘনবসতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যাতে নগরটি ঘিঞ্জি রূপ না নেয়।
তিনটি পৃথক ধাপে, প্রথম ধাপ ২০২৫-২০৩৫, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩৫-২০৪৫ এবং তৃতীয় ধাপ ২০৪৫-২০৫০ সাল পর্যন্ত এই সুবিশাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। তবে পূর্বে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভিটেমাটি হারানো স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে নতুন করে অধিগ্রহণ সংক্রান্ত আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আনোয়ারা পেশাজীবী পরিষদের প্রতিনিধিরা বলছেন, খাদ্যের নিরাপত্তার স্বার্থেই কৃষিজমি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
এই প্রসঙ্গে সিডিএ উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী জানান, "কর্ণফুলীর দক্ষিণ অংশে দিন দিন নগরায়ণের প্রয়োজনীয়তা ও চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিত একটি নতুন নগরী উপহার দিতে আমরা মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছি। আনোয়ারার চাতরী, বৈরাগ ও বারখাইন এবং কর্ণফুলীর বড়উঠান ইউনিয়নের অংশবিশেষ এই মেগা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। তবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য, উর্বর কৃষিজমি যতটা সম্ভব অক্ষত রাখা এবং স্থানীয়দের স্বার্থ রক্ষা করা। বঙ্গবন্ধু টানেল দিয়ে এই প্রস্তাবিত এলাকা থেকে মূল চট্টগ্রাম শহরের দূরত্ব মাত্র ১০ মিনিটের, অন্যদিকে কক্সবাজার ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথেও রয়েছে চমৎকার সংযোগ। ফলে এই প্রকল্প ঘিরে সর্বস্তরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আমরা সকল স্টেকহোল্ডারদের মতামত সংগ্রহ করছি।"
একই প্রসঙ্গে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন নলেন, "দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও পটিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সিডিএ একটি অত্যাধুনিক ‘স্যাটেলাইট টাউন’ গড়ার লক্ষ নিয়ে এগোচ্ছে। বর্তমানে গণশুনানি ও মতামত গ্রহণের পর্ব চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্পের গ্যাজেট প্রকাশের পরপরই আমরা মূল অবকাঠামো নির্মাণ ও রূপরেখা বাস্তবায়নের কাজে নেমে পড়ব। আনোয়ারায় ইতিমধ্যে বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব গড়ে উঠেছে এবং চায়না ইকোনমিক জোনের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগকারী এখানে অবস্থান করবেন। তাই দেশি-বিদেশি, উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত, সব শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রার মান বিচারে আন্তর্জাতিক মানের আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নত সড়ক যোগাযোগ দিয়ে এটিকে একটি মডেল টাউনে রূপ দেওয়া হবে। এই শহর বাস্তবায়িত হলে মূল চট্টগ্রাম নগরীর ওপর জনসংখ্যার চাপ ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে।"

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কর্ণফুলী নদীর ওপারে শুধু যে শিল্পায়নের চাকা ঘুরছে তা নয়, এবার সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে যাচ্ছে এক সম্পূর্ণ আধুনিক ও পরিকল্পিত নতুন শহর। উর্বর কৃষিজমিকে নির্বিচারে ধ্বংস না করে, বরং বহুফসলী জমিকে সুরক্ষার বলয়ে রেখেই দক্ষিণ চট্টগ্রামজুড়ে এই নতুন স্যাটেলাইট টাউন গড়ার দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নদীর উত্তর তীরের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ওপর থেকে আবাসন, যানজট এবং ঘনবসতির যে শ্বাসরুদ্ধকর চাপ, তা এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমিয়ে আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান ২০২৫–২০৫০-এর আওতায় প্রণীত ‘আনোয়ারা অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান’-এ বহুল আলোচিত ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ বা এক নগর দুই শহরের বাস্তব রূপরেখা উন্মোচিত করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল চালুর পর থেকেই কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব ঘটে গেছে। টানেল এবং নির্মিত ৬ লেনের সংযোগ সড়ক ধরে এই মেগা পরিকল্পনা বিস্তৃত হচ্ছে বাঁশখালী ও কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত। আনোয়ারার চাতরী, বৈরাগ ও বারখাইন ইউনিয়ন এবং কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান এলাকার প্রায় ৭ হাজার ৩১৫ দশমিক ৫ একর জমি জুড়ে বিশাল এই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়েছে। সিডিএ-র প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস হলেও আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ এই নতুন শহরে বাস করবে ৭ লাখ ২৪ হাজারের বেশি মানুষ। একই সময়ে কর্মসংস্থানের পরিধি বর্তমানের প্রায় সাড় ১৯ হাজার থেকে লাফিয়ে পৌঁছে যাবে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৩৩-এ। চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন, কোরিয়ান ইপিজেড এবং কাফকোর মতো বড় শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পেশাজীবীদের জন্য এই শহরটি হবে এক বিশ্বমানের ঠিকানা।
তবে এই বিশাল নগর গড়ার ক্ষেত্রে চিরাচরিত পরিবেশবিধ্বংসী পদ্ধতির বদলে নেওয়া হয়েছে এক ব্যতিক্রমী টেকসই কৌশল। পরিকল্পনা এলাকার প্রায় ৫৭ শতাংশ জমিই বর্তমানে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। প্রায় ৪ হাজার ১৪৭ একর মোট কৃষিজমির মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৩৮৮ একর জমিকে পুরোপুরি অস্পর্শনীয় রেখে সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সিডিএ সূত্রে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এলাকার কোনো তিন ফসলী বা দুই ফসলী জমির ওপর কোনো সরকারের কোপ পড়বে না। কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখে বাকি প্রায় ২ হাজার ৮৮২ একর বা ৩৯ শতাংশ জমিতে আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক, মিশ্র ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সবুজ এলাকার সমন্বয়ে নগর রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া সরাসরি ভারী শিল্পের জন্য সাড়ে সাত শতাংশ বা ৫০০ একরের কিছু বেশি জমি প্রস্তাবিত থাকলেও শহরের আবাসিক সীমানার ভেতরে কেবল কুটির ও সহায়ক শিল্পের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
দ্রুতগামী নাগরিক জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে নতুন শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আনা হচ্ছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রস্তাব করা হয়েছে মোট ৪৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে যেমন থাকবে ১১ কিলোমিটারের বেশি প্রাইমারি ডিস্ট্রিবিউটর সড়ক, তেমনি থাকবে ২১ কিলোমিটারের বেশি সেকেন্ডারি এবং ১৫ কিলোমিটারের বেশি লোকাল সড়ক। মোট ১৯ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার একদম নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো প্রায় ২৪ কিলোমিটার সড়ক ৪০ থেকে ১২০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করার বড় পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনকে সুগম করতে আনোয়ারা-পটিয়া সড়ককে ১৬০ ফুট পর্যন্ত চওড়া করা হবে এবং আর-১৭০ সড়কটিকে মাতারবাড়ী-চট্টগ্রাম বন্দর সংযোগকারী মূল করিডর হিসেবে শক্তিশালী করা হবে। শিল্পাঞ্চলের ভারী যানবাহনের কারণে যাতে যানজট না হয়, সে জন্য ২৪ দশমিক ৫ একর জায়গাজুড়ে ১ হাজার ট্রাক ধারণক্ষমতার বিশাল ট্রাক টার্মিনাল এবং ৩ দশমিক ২ একর জায়গায় আঞ্চলিক বাস টার্মিনাল গড়ে তোলা হবে। ভবিষ্যতে এর সাথে কমিউটার রেল যোগাযোগের সুযোগও খোলা রাখা হয়েছে।
একটি পূর্ণাঙ্গ মানসম্মত শহরের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত নাগরিক সুবিধার সুনির্দিষ্ট হিসাব নিকাশ রাখা হয়েছে এই মাস্টারপ্ল্যানে। ২০৫০ সালের সম্ভাব্য জনসংখ্যার সেবা নিশ্চিত করতে ৮টি নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, ৯টি ক্লিনিক, একটি ৬ একরের বড় হাসপাতাল এবং ১৮টি আধুনিক কিচেন মার্কেট তৈরি করা হবে। নাগরিকদের মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য ২০ একর জমি খেলার মাঠ এবং ৪০ একর জমি পার্ক ও লেকের জন্য রাখা হয়েছে। কালা বিবির দীঘি, মনু মিয়ার দীঘি ও মুরালী খালের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে মনোরম পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে প্রাকৃতিক নালা ও খালগুলোকে অক্ষত রাখার পাশাপাশি ওয়াসা, বিদ্যুৎ, ফায়ার সার্ভিস ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক জমি বরাদ্দ রাখা নিশ্চিত করা হয়েছে। সিভিল এভিয়েশনের নিয়ম মেনে ভবনের উচ্চতা ও ঘনবসতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যাতে নগরটি ঘিঞ্জি রূপ না নেয়।
তিনটি পৃথক ধাপে, প্রথম ধাপ ২০২৫-২০৩৫, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩৫-২০৪৫ এবং তৃতীয় ধাপ ২০৪৫-২০৫০ সাল পর্যন্ত এই সুবিশাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। তবে পূর্বে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভিটেমাটি হারানো স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে নতুন করে অধিগ্রহণ সংক্রান্ত আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আনোয়ারা পেশাজীবী পরিষদের প্রতিনিধিরা বলছেন, খাদ্যের নিরাপত্তার স্বার্থেই কৃষিজমি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
এই প্রসঙ্গে সিডিএ উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী জানান, "কর্ণফুলীর দক্ষিণ অংশে দিন দিন নগরায়ণের প্রয়োজনীয়তা ও চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিত একটি নতুন নগরী উপহার দিতে আমরা মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছি। আনোয়ারার চাতরী, বৈরাগ ও বারখাইন এবং কর্ণফুলীর বড়উঠান ইউনিয়নের অংশবিশেষ এই মেগা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। তবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য, উর্বর কৃষিজমি যতটা সম্ভব অক্ষত রাখা এবং স্থানীয়দের স্বার্থ রক্ষা করা। বঙ্গবন্ধু টানেল দিয়ে এই প্রস্তাবিত এলাকা থেকে মূল চট্টগ্রাম শহরের দূরত্ব মাত্র ১০ মিনিটের, অন্যদিকে কক্সবাজার ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথেও রয়েছে চমৎকার সংযোগ। ফলে এই প্রকল্প ঘিরে সর্বস্তরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আমরা সকল স্টেকহোল্ডারদের মতামত সংগ্রহ করছি।"
একই প্রসঙ্গে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন নলেন, "দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও পটিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সিডিএ একটি অত্যাধুনিক ‘স্যাটেলাইট টাউন’ গড়ার লক্ষ নিয়ে এগোচ্ছে। বর্তমানে গণশুনানি ও মতামত গ্রহণের পর্ব চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্পের গ্যাজেট প্রকাশের পরপরই আমরা মূল অবকাঠামো নির্মাণ ও রূপরেখা বাস্তবায়নের কাজে নেমে পড়ব। আনোয়ারায় ইতিমধ্যে বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব গড়ে উঠেছে এবং চায়না ইকোনমিক জোনের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগকারী এখানে অবস্থান করবেন। তাই দেশি-বিদেশি, উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত, সব শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রার মান বিচারে আন্তর্জাতিক মানের আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নত সড়ক যোগাযোগ দিয়ে এটিকে একটি মডেল টাউনে রূপ দেওয়া হবে। এই শহর বাস্তবায়িত হলে মূল চট্টগ্রাম নগরীর ওপর জনসংখ্যার চাপ ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে।"

আপনার মতামত লিখুন