জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও নানা বিতর্ক পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চার দশকের বেশি সময় ধরে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি

৪৮ বছরে বিএনপি: গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলা



৪৮ বছরে বিএনপি: গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলা

একদলীয় শাসনের রাজনৈতিক শূন্যতা, রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। প্রতিষ্ঠার পর চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোতে দলটি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায়, কখনো বিরোধী দলের ভূমিকায় এবং কখনো রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছে। আজ ১ সেপ্টেম্বর দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ফিরে দেখা হচ্ছে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা যার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তির রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

যে প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্ম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে রয়েছে গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস। পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে প্রায় ২৫ বছর ধরে পূর্ব বাংলার মানুষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যায়।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা গণতান্ত্রিকভাবে প্রকাশ পেলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

কিন্তু স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে গিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় আসে বড় পরিবর্তন।

এই অস্থির ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যেই রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিসরে আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমান: সৈনিক থেকে রাজনৈতিক নেতা

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে খেমকারান রণাঙ্গনে তাঁর সামরিক ভূমিকা তাঁকে পরিচিত করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে তাঁর উত্থান ঘটে। সে সময় দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থির। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক পরিসর পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তাঁর রাজনৈতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বহুদলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রও পুনরায় বিস্তৃত হয়।

১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮: বিএনপির আত্মপ্রকাশ

পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেন জিয়াউর রহমান।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা বটমূলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে।

দলটির ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।

বিএনপির ঘোষণাপত্রে উৎপাদনের রাজনীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও জনগণের গণতন্ত্রের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক মানবমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথাও বলা হয়।

ঘোষণাপত্রে জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক

বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া।

ঘোষণাপত্রে গ্রাম-গঞ্জের মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করা, পল্লী উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নারী ও যুবসমাজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়।

একই সঙ্গে গণনির্বাচিত জাতীয় সংসদকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রক্ষাকবচ হিসেবে শক্তিশালী করা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের অঙ্গীকার

বিএনপির গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রে বহুদলীয় রাজনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদীয় সরকারের মাধ্যমে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়া রাজনৈতিক গোপন সংগঠন ও সশস্ত্র ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির বিরোধিতার কথাও দলটির ঘোষিত নীতিতে রয়েছে।

অর্থাৎ দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক দর্শনে শুধু ক্ষমতা অর্জন নয়; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই একটি পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা ছিল।

জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্ব

বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর একটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।

এই দর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ড, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রাখার কথা বলা হয়।

পররাষ্ট্রনীতিতেও জোটনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সার্বভৌমত্ব ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতি ঘোষণাপত্রে স্থান পায়।

অর্থনীতিতে ‘উৎপাদনের রাজনীতি’

বিএনপির ঘোষণাপত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ‘উৎপাদনের রাজনীতি’কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মুক্তবাজার অর্থনীতি, উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, সুষ্ঠু শ্রমনীতি এবং বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়।

পল্লী উন্নয়নকেও দেওয়া হয় বিশেষ গুরুত্ব। কৃষি, শ্রম, শিল্প ও মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য দলটির রাজনৈতিক দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়।

৪৮ বছরের পথচলায় অর্জন ও বিতর্ক

প্রতিষ্ঠার পর বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্রুত একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বে আসেন খালেদা জিয়া। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি পরবর্তী সময়ে একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী সরকারগুলোর সময় বিএনপি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকে।

তবে দলটির দীর্ঘ পথচলা কেবল সাফল্যের নয়; রয়েছে রাজনৈতিক সংঘাত, নির্বাচনকেন্দ্রিক বিতর্ক, আন্দোলন, মামলা, দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে নানা সমালোচনাও। ফলে বিএনপির ইতিহাস মূল্যায়নে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

আজকের বিএনপি, আগামী দিনের প্রত্যাশা

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে এসে বিএনপির সামনে যেমন রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার, তেমনি রয়েছে নতুন সময়ের নতুন চ্যালেঞ্জ।

একটি পরিবর্তনশীল বাংলাদেশের সামনে এখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের মতো বড় প্রশ্ন রয়েছে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণাপত্রে যে গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছিল, সময়ের পরিবর্তনে সেই অঙ্গীকারগুলো কীভাবে বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ নেয়—সেটিই এখন দলটির সামনে বড় পরীক্ষা।

ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমানের রাজপথে

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যে রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছিল, ৪৮ বছর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ এই পথচলায় বিএনপি কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রে, কখনো বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্বে, আবার কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের রাজপথে থেকেছে।

প্রতিষ্ঠার দর্শন, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা—এই তিনের সমন্বয়েই আজকের বিএনপি।

৪৮ বছরের এই পথচলা তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনীতি, জাতীয়তাবাদী চিন্তা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


আপনার মতামত লিখুন

জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


৪৮ বছরে বিএনপি: গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলা

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একদলীয় শাসনের রাজনৈতিক শূন্যতা, রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। প্রতিষ্ঠার পর চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোতে দলটি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায়, কখনো বিরোধী দলের ভূমিকায় এবং কখনো রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছে। আজ ১ সেপ্টেম্বর দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ফিরে দেখা হচ্ছে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা যার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তির রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

যে প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্ম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে রয়েছে গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস। পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে প্রায় ২৫ বছর ধরে পূর্ব বাংলার মানুষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যায়।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা গণতান্ত্রিকভাবে প্রকাশ পেলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

কিন্তু স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে গিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় আসে বড় পরিবর্তন।

এই অস্থির ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যেই রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিসরে আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমান: সৈনিক থেকে রাজনৈতিক নেতা

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে খেমকারান রণাঙ্গনে তাঁর সামরিক ভূমিকা তাঁকে পরিচিত করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে তাঁর উত্থান ঘটে। সে সময় দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থির। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক পরিসর পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তাঁর রাজনৈতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বহুদলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রও পুনরায় বিস্তৃত হয়।

১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮: বিএনপির আত্মপ্রকাশ

পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেন জিয়াউর রহমান।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা বটমূলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে।

দলটির ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।

বিএনপির ঘোষণাপত্রে উৎপাদনের রাজনীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও জনগণের গণতন্ত্রের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক মানবমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথাও বলা হয়।

ঘোষণাপত্রে জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক

বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া।

ঘোষণাপত্রে গ্রাম-গঞ্জের মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করা, পল্লী উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নারী ও যুবসমাজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়।

একই সঙ্গে গণনির্বাচিত জাতীয় সংসদকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রক্ষাকবচ হিসেবে শক্তিশালী করা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের অঙ্গীকার

বিএনপির গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রে বহুদলীয় রাজনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদীয় সরকারের মাধ্যমে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়া রাজনৈতিক গোপন সংগঠন ও সশস্ত্র ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির বিরোধিতার কথাও দলটির ঘোষিত নীতিতে রয়েছে।

অর্থাৎ দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক দর্শনে শুধু ক্ষমতা অর্জন নয়; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই একটি পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা ছিল।

জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্ব

বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর একটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।

এই দর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ড, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রাখার কথা বলা হয়।

পররাষ্ট্রনীতিতেও জোটনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সার্বভৌমত্ব ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতি ঘোষণাপত্রে স্থান পায়।

অর্থনীতিতে ‘উৎপাদনের রাজনীতি’

বিএনপির ঘোষণাপত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ‘উৎপাদনের রাজনীতি’কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মুক্তবাজার অর্থনীতি, উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, সুষ্ঠু শ্রমনীতি এবং বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়।

পল্লী উন্নয়নকেও দেওয়া হয় বিশেষ গুরুত্ব। কৃষি, শ্রম, শিল্প ও মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য দলটির রাজনৈতিক দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়।

৪৮ বছরের পথচলায় অর্জন ও বিতর্ক

প্রতিষ্ঠার পর বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্রুত একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বে আসেন খালেদা জিয়া। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি পরবর্তী সময়ে একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী সরকারগুলোর সময় বিএনপি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকে।

তবে দলটির দীর্ঘ পথচলা কেবল সাফল্যের নয়; রয়েছে রাজনৈতিক সংঘাত, নির্বাচনকেন্দ্রিক বিতর্ক, আন্দোলন, মামলা, দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে নানা সমালোচনাও। ফলে বিএনপির ইতিহাস মূল্যায়নে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

আজকের বিএনপি, আগামী দিনের প্রত্যাশা

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে এসে বিএনপির সামনে যেমন রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার, তেমনি রয়েছে নতুন সময়ের নতুন চ্যালেঞ্জ।

একটি পরিবর্তনশীল বাংলাদেশের সামনে এখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের মতো বড় প্রশ্ন রয়েছে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণাপত্রে যে গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছিল, সময়ের পরিবর্তনে সেই অঙ্গীকারগুলো কীভাবে বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ নেয়—সেটিই এখন দলটির সামনে বড় পরীক্ষা।

ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমানের রাজপথে

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যে রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছিল, ৪৮ বছর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ এই পথচলায় বিএনপি কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রে, কখনো বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্বে, আবার কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের রাজপথে থেকেছে।

প্রতিষ্ঠার দর্শন, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা—এই তিনের সমন্বয়েই আজকের বিএনপি।

৪৮ বছরের এই পথচলা তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনীতি, জাতীয়তাবাদী চিন্তা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস

সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ জাতীয় সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত